ঢাকা সংবাদদাতা: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে বুধবার দুপুরে বিএনপির সমর্থক ও সাধারণ আইনজীবীদের উপর হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে রক্তাক্ত ও জখম করেছে সরকার দলীয় আইনজীবীরা। তাদের তাণ্ডবে সুপ্রিমকোর্টে অনেকেই আহত হয়েছেন।
বিগত মার্চ মাসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোটগ্রহণের শেষে বিএনপির প্যানেল হতে দাঁড়ানো সুপ্রিম কোর্টের সম্পাদক পদ প্রার্থী ও বর্তমান সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল ৪৮ ভোটে এগিয়ে থাকলে সেই ফল আওয়ামীলীগের পক্ষের সম্পাদক পদ প্রার্থী আব্দুন নূর দুলাল এবং তার পক্ষের লোকজন মেনে নিতে অস্বীকার করে।
ভোট গণনার সময় রাতের বেলা তারা সুপ্রিম কোর্টের নির্বাচন কমিটির আহবায়ক ও আপিল বিভাগের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মশিউজ্জামানকে সারারাত অবরুদ্ধ করে অকথ্য গালিগালাজের মাধ্যমে পুনরায় ভোট গণনার নির্দেশ দিয়ে হুমকি প্রদান করে এবং আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করতে বাধা দেয়।
এসময় তারা তার বিরুদ্ধে টাকা খাওয়ার কথা বলে তাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকেন এবং তার উদ্দেশ্যে পানির বোতল ও টিস্যু বাক্স নিক্ষেপ করেন।
এইসময় টেবিলে বসা মমতাজ উদ্দিন মেহেদী, মমতাজ উদ্দিন ফকির ও শাহ মঞ্জুরুল হকসহ সিনিয়র আওয়ামী আইনজীবীদের হাসাহাসি করতে দেখা যায়।
নির্বাচন কমিটির কয়েকজন এতে বাধা দিলে তারা শারীরিকভাবে আওয়ামীলীগের বহিরাগতদের হাতে লাঞ্চিত হন।
৮২ বছর বয়সী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মশিউজ্জামান এর ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরেরদিন বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলে চলে আসেন।
পরে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।
এতে করে তিন সপ্তাহেরও বেশী সময় ধরে বিষয়টি ঝুলন্ত অবস্থার মধ্যে থাকে।
এসময় মশিউজ্জামানকে নির্বাচনের বিষয়টি সুরাহা করতে কেউ কেউ অনুরোধ করলেও তিনি দৈহিক নিরাপত্তাহীন হবার আশঙ্কায় রাজি হননি।
পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট বারের বেশ কয়েকজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি এই বিষয়টি নিয়ে মিটিং করে মশিউজ্জামানকে বিষয়টি সমাধান করার অনুরোধ করলে খবর প্রচারিত হয় যে তিনি এতে রাজি হয়েছেন।
কিন্তু ইলেকশনে হেরে যাবার আশঙ্কায় আব্দুন নূর দুলাল মশিউজ্জামানকে মানতে অস্বীকার করেন এবং বিতর্কিত ব্যক্তি বলে আখ্যায়িত করে গণমেসেজ পাঠাতে থাকেন। ফলে বিষয়টি আবারো ঝুলে যায় এবং পাল্টা পাল্টি বিক্ষোভ ও কর্মসূচী চলতে থাকে।
অবশেষে গতকাল নতুন নির্বাচিত কমিটির নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড সুপ্রিম কোর্টে ঝোলালে আওয়ামীলীগের আইনজীবীরা একে অবৈধ বলে ফেসবুকে ও বিভিন্ন জায়গাতে হুমকি দিতে থাকেন।
বুধবার দুপুরে রুহুল কুদ্দুস কাজলের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে আওয়ামীলীগের আইনজীবীদের সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে হাতুড়ি মিছিল এবং বিএনপির আইনজীবীদের উপর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে রক্তাক্ত হামলার ছবি প্রকাশিত হয়। ছবিতে আঘাত পেয়ে অ্যাডভোকেট আয়েশা আকতারকে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
অপর ছবিতে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের জুনিয়র অ্যাডভোকেট মাসুদ রানার হাত থেকে আঘাত পেয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়।
এছাড়া ভিডিওতে আওয়ামীলীগ সমর্থক এএজি মলিকে সেক্রেটারি রুমের সামনে বাক্সের উপরে উঠে হাতুড়ি উঠিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়।
অনলাইন ঘুরে বিএনপি সমর্থক ও সাধারণ আইনজীবীদের তীব্র নিন্দা এবং এর বিপরীতে আওয়ামীলীগের আইনজীবীদের ফেসবুকে তীব্র বিজয় উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
অপরদিকে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আদালতে ভয়ঙ্কর অরাজকতা এবং হিংস্র আওয়ামী সমর্থক আইনজীবীদের মহড়া ও হামলার কারণে সাধারণ আইনজীবী ও মানুষের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র হতাশা এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এই লাগামহীন সহিংসতা ও ইস্যুকে কেন্দ্র করে হাই কমান্ডের সুনজরে লাইমলাইটে আসা, নতুন পদ ও পদোন্নতির আশা এবং এএজি, ডিএজি এবং বিচারপতি হবার চিন্তাতে বিপুল সংখ্যক আওয়ামী আইনজীবীর মধ্যে উন্মত্ত প্রতিযোগিতা চলতে দেখা গেছে।
উল্লেখ্য যে বিগত ৩১শে মার্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য নবনিমির্ত ১২ তলা ভবন ‘বিজয়-৭১’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এতে আছে ৩২টি এজলাস তথা বিচার কক্ষ ও বিচারপতিদের জন্য ৫৬টি চেম্বার।
আর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনের ভেতরে এই নতুন বহুতল কোর্ট ভবন উদ্বোধন হবার কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই অর্ধশতাধিক বিচারপতি নিয়োগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে।
ফলে বিচারপতির পদপ্রার্থীদের মধ্যে এটি নিয়ে বেপরোয়া ও মরণপণ প্রতিযোগিতা চলছে, যার প্রভাব এই নির্বাচন সংক্রান্ত আন্দোলনেও অনিবার্যভাবেই পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।















