ঢাকা সংবাদদাতা: দেখতে দেখতে বয়স আড়াই বছর পার হয়ে গেছে। বিচার-সালিস অনেক হয়েছে। অথচ শিশু মাহীর বাবা কে তা জানা যায়নি। এই দাবিতে অবিবাহিত মা আছিয়া খাতুন (১৯) মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এখন পর্যন্ত কোনো কিনারা হয়নি।
আছিয়া খাতুনের অভিযোগ, ‘আমাকে জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতনের পর সালিস বিচারের নামে মাতবররা আসামির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমরা টাকা নেইনি। আমরা মামলা করেছি। ডিএনএ টেস্ট রিপোর্ট নিয়েও জাল জালিয়াতি হয়েছে। আমি আবারও ডিএনও টেস্টের জন্য রক্ত দিয়েছি। এ রিপোর্ট কী হবে তা জানি না। আমি আমার মেয়ের পিতৃত্বের স্বীকৃতি চাই।’
আছিয়া খাতুন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার আজিজপুর গ্রামের মোমিন গাজীর মেয়ে।
মেয়ে ও মা মসিরনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে আছিয়া খাতুন। প্রতিবন্ধী আছিয়ার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আছিয়া জানান, ২০১৪ সালের ২৩ মে তাঁর প্রতিবেশী নানি ফাতেমা খাতুন তাঁকে একই গ্রামের মোকছেদ আলীর (৪৮) বাড়িতে নিয়ে যান। পরে কৌশলে একটি ঘরে মোকছেদ আলী ও তাঁকে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজায় শিকল লাগিয়ে দেন ফাতেমা খাতুন। আছিয়া জানান, এ সময় মোকছেদ আলী জোর করে তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান। এর ফলে কিছুদিন পর থেকে আছিয়ার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দেখা দিলে ডাক্তারি প্রতিবেদনে জানা যায় আছিয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। তাঁর বাবা বিষয়টি অভিযোগ আকারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যকে জানান। পরে আজগর আলীর নেতৃত্বে এবং প্রতিবেশী মোজাম্মেল হক, আমির আলী ও আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে সালিস বৈঠকে মোকছেদ আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার ৫০ হাজার টাকা সালিসদার আবদুল হামিদ নেন। সালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই সঙ্গে তাঁর গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু আছিয়া, আছিয়ার বাবা ও মা কোনো টাকা নিতে অসম্মতি জানান। তাঁরা আছিয়ার গর্ভের সন্তান নষ্ট করতেও অসম্মতি প্রকাশ করেন।
পরে আছিয়ার মামা সামজেদ হোসেন সাজু দেবহাটা থানায় একটি ধর্ষণ মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মেজবাহউদ্দিন মামলাটির অভিযোগপত্র দেন। এতে মোকছেদ আলী ও সহযোগিতাকারী ফাতেমা খাতুনকে অভিযুক্ত করা হয়। পুলিশ ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করে। ফাতেমা খাতুন তাঁর জবানবন্দিতে ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরে স্বীকারোক্তি দেন।
আছিয়ার মামা মামলার বাদী সামজেদ হোসেন জানান, আসামিপক্ষের আবেদন অনুযায়ী আছিয়া ও শিশুটির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তিনি জানান, ডিএনএ টেস্টে নেগেটিভ রিপোর্ট আসায় আছিয়ার মেয়ের পিতৃত্বের দাবি ঝুলে যায়। এর ফলে দুই আসামিই খালাস পেয়ে যান। আছিয়ার মামা আরো বলেন, ‘আমি এই রিপোর্টে নারাজি দিয়েছি। সে অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় নিয়ম অনুযায়ী রক্ত দিয়েছে আছিয়া, তার মেয়ে মাহী ও আসামি মোকছেদ আলী। এখন পর্যন্ত এই রিপোর্ট সাতক্ষীরা আদালতে পৌঁছায়নি।’
জানতে চাইলে দেবহাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আজগর আলী বলেন, ‘আমি গ্রামের মানুষের ডাকে সালিসে বসেছিলাম। আসামি দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। নগদ ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছিল সে। আমি সে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করেছি। বরং আছিয়ার পরিবারকে মামলা করার পরামর্শ দিয়ে তাদের সহায়তা করছি।’ তিনি বলেন, আছিয়ার বাবা খুবই গরিব। অন্যের জমিতে কাজ করে। নদী-খালে মাছ ধরে দিন চলে পরিবারটির। এ জন্য তাদের কিছু আর্থিক সহায়তার পক্ষে আমি কথা বলেছিলাম। যদিও সালিস করা আইনসিদ্ধ নয়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মেজবাহউদ্দিন বলেন, ‘ধর্ষণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তাই অভিযোগপত্র দিয়েছিলাম। এখন বিষয়টি আদালতের।’















