দশ মাসে ১ হাজার ১৯১ ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত

164

ঢাকা সংবাদদাতা : করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশে করোনায় লকডাউনের সময়ে নারী-পুরুষ সবাইকে ঘরবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়েছে। আর এ ধরনের দুর্যোগ নারী ও পুরুষকে ভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করে। আর সেই প্রভাবের রেশ হিসেবে দেশের সর্বত্র নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অক্টোবর মাসেই ৪৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২১৬ জন। আর গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৪ জন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, গত দশ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ১৯১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
অভিজ্ঞমহল বলছেন, বাংলাদেশের মতো সমাজব্যবস্থায় নারীর জীবন এবং স্বাধীনতা শুধু পরিবার নয়, গোটা সমাজই তা নির্ধারণ করে। স্বাভাবিক সময়ে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। করোনাকালে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অপরদিকে নারীর প্রতি এসময় সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে জাতিসংঘ একে কোভিড-১৯ এর ছায়া মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের মধ্যে ৯০ শতাংশই নারী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নারী যেমন একদিকে ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে, অপর দিকে নিজেরাই নির্যাতন নামক ভাইরাসের শিকার হচ্ছেন। এই মহাসংকটেও নারীর প্রতি মানবিক হতে পারছে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সূত্র জানায়, তাদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছেন, ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে ১০১ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ২৫ শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই সময়ে ১৬ শিশুসহ ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৩ জনকে। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ৫ জন, যার মধ্যে ৩ শিশু রয়েছে। এছাড়া, ১২ শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ৪ শিশু এবং এসিডদগ্ধের কারণে মারা গেছে ১ জন। আবার অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে ২ জন। যার মধ্যে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে ১০ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে মোট ১২ জন। এরমধ্যে ৮ শিশু। পাচারের শিকার হয়েছে ৪ জন। যারমধ্যে এক শিশু পাচার শিকার হয়েছে। যৌন পল্লীতে ৩ জনকে বিক্রি করা হয়েছে। বিভিন্ন কারণে ১১ শিশুসহ ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ৬ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫ শিশুসহ ২১ জন। বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে ৬টি। সাইবার ক্রাইম অপরাধের শিকার ৪ জন শিশুসহ ৮ জন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ৫ শিশুসহ আত্মহত্যা করেছে ৬ জন। ৮ শিশুসহ ৪৬ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

অপরদিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর সূত্র জানায়, চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত ১ অক্টোবর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে, গত ৯ মাসে ১৬১ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে যৌন হয়রানি কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ৯ পুরুষ নিহত হয়েছেন।

এ সময়ে দেশে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা ও এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবার ৯ মাসে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৩২ জন নারী। এর মধ্যে হত্যার শিকার হন ২৭৯ নারী এবং পারিবারিক নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭৪ নারী। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৬৮ নারী। এর মধ্যে যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৩ জন। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৬৬ জনকে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৭ জন নারী। এছাড়া স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ১২ নারী। আবার ১১ জন গৃহকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন এবং বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২ জন গৃহকর্মী। আর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২ জন।

আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য ছিল।