এবার ভুটানের ভূখণ্ডেও হাত বাড়াচ্ছে চীন!

398

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: একের পর এক প্রতিবেশী দেশেগুলোর বিভিন্ন ভূখণ্ড নিজেদের বলে দাবি করে যাচ্ছে চীন। লাদাখে ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের পটভূমিতেই এবার প্রতিবেশী ভুটানের পূর্বাঞ্চলে একটি বিস্তীর্ণ অংশের ওপরও নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করেছে চীন।

মূলত দিল্লির ওপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যেই ভুটানের ওই সাকতেং অভয়ারণ্যকে চীন নিজেদের বলে দাবি করছে বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের। কারণ ভুটানের অখণ্ডতা রক্ষা ও প্রতিরক্ষার জন্য ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ।

ভুটানের পূর্বদিকে ত্রাশিগিং জেলার ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় প্রায় সাড়ে ছশো বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে একটি অভয়ারণ্যের নাম সাকতেং যা বিরল বন্য পশুপাখির আবাসভূমি। মাসখানেক আগে ‘গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফেসিলিটি’ বা জিইএফ একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন বৈঠকের আয়োজন করেছিল। সেখানেই চীন প্রথম দাবি করে সাকতেং তাদের ভূখণ্ড।

বিশ্ব ব্যাঙ্কে ভারতের অন্যতম প্রতিনিধি অপর্ণা সুব্রামনি ওই বৈঠকে ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-মালদ্বীপের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি চীনের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
এরপর গেলো সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকাকে পাঠানো এক বিবৃতিতে সাকতেং-য়ের ওপর তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং ভারতকে ইঙ্গিত করে বলেছে ‘কোনও তৃতীয় পক্ষ যেন এখানে নাক না-গলায়’!

থিম্পুতে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইন্দর পাল খোসলা বলেন, আমার মতে চীন এখন পুরোপুরি একটা সম্প্রসারণবাদী দেশের মতো আচরণ করছে। তারা ভুটানের এমন একটা জায়গা দাবি করে বসেছে যেটা নিয়ে আগে কখনও বিতর্ক ছিল না। ওই দুই দেশের মধ্যে চব্বিশ রাউন্ড সীমান্ত বৈঠক হলেও সাকতেং কিন্তু কখনও আলোচনার টেবিলেই ওঠেনি। এখন তো দেখছি তারা কোনও সীমান্ত সমঝোতারই ধার ধারছে না, এমন কী রাশিয়ার ভ্লাদিভস্টক পর্যন্ত দাবি করছে। আমরা শুধু আশা করতে পারি, চীনের এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট বেশিদিন চলবে না এবং তারা এই সব বন্ধ করবে।

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি-তে চীন বিশেষজ্ঞ এম টেলর ফ্র্যাভেল জানাচ্ছেন, চীনের এই দাবির পেছনে আছে ১৭১৫ সালে তিব্বত ও ভুটানের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তি।

১৯৪৯ থেকে সাকতেং ভুটানের অংশ, কিন্তু এখন চীন বলছে যেহেতু তিব্বত তাদের, সুতরাং সাকতেংয়ের ওপরও তাদের অধিকার বর্তায়।

দিল্লিতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর ইন্দ্রাণী বাগচী বলেন, ওই অঞ্চলের মানচিত্রটা দেখলেই বুঝবেন ওই সাকতেং হল ভারতের অরুণাচল প্রদেশের যে সেলা পাসে ‘৬২-র ভারত-চীন যুদ্ধ হয়েছিল তার ঠিক উত্তর দিকের এলাকা। চীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল গোটা অরুণাচল প্রদেশটাকেই কব্জা করে নেওয়া, ফলে এটা সেই পরিকল্পনার একটা অংশ হতেই পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে এই সময়টাকে বেছে নেওয়া হয়েছে কারণ চীন দেখতে পাচ্ছে লাদাখ বা কালাপানি নিয়ে ভারত আগে থেকেই চাপে আছে। ফলে দিল্লির ওপর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোও একটা উদ্দেশ্য হতে পারে।
তৃতীয়ত, চীন ভুটানের ওপর এই চাপটা এমন একটা মাত্রায় নিয়ে যেতে চায় যাতে ভুটান ভারতকে বলতে বাধ্য হয় যে আমরা চীনের সঙ্গে আলাদাভাবে বিষয়টা নিয়ে বোঝাপড়া করে নিচ্ছি!

বস্তুত ভারতের প্রভাব বলয় থেকে ভুটানকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চীনের দীর্ঘদিনের। তবে তিন বছর আগে ডোকলাম সঙ্কটের সময় যেভাবে ভারতীয় সেনারা ভুটানের হয়ে চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল, চীনকে সেটা বেশ অবাকই করেছিল। তারপরেও অবশ্য ভুটানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করার প্রবল চেষ্টা চালিয়ে গেছে চীন, থিম্পুতে তারা দূতাবাসও খুলতে চেয়েছে বার বার।
সাকতেংয়ের ওপর চীনের দাবিকে নস্যাৎ করে ভুটানের যে কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র বা ডিমার্শ, সেটাও পাঠানো হয়েছে দিল্লিতে চীনের দূতাবাসেই।

আর ভারত মনে করছে, লাদাখের গালওয়ান বা প্যাংগং লেকে চীনের সঙ্গে এবং কালাপানিতে নেপালের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ তো আছেই এখন সাকতেং-এও ভুটানের বকলমে আসলে ভারতের সঙ্গেই চীন বিরোধের নতুন একটি ফ্রন্ট খুলতে চাইছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা