ঢাকা সংবাদদাতা: বিমান বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে তুলতে বরিশাল ও সিলেটে বিমান ঘাঁটি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার যশোরে বিমান বাহিনী একাডেমিতে নবীন অফিসারদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে তার বক্তব্যে এই ঘোষণা আসে।
শেখ হাসিনা বলেন, “বরিশাল ও সিলেটে নতুন দুটি বিমান বাহিনী ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। আমার বিশ্বাস, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আরও শক্তিশালী হবে এবং এর সক্ষমতা বাড়বে।”
‘মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (যুদ্ধ বিমান), উন্নত পরিবহন বিমান, অত্যাধুনিক বেসিক ট্রেনিং (প্রশিক্ষণ) হেলিকপ্টার, জেট ট্রেনার এয়ারক্রাফট (প্রশিক্ষণ বিমান), সিমুলেটর, আন-ম্যানড এরিয়াল ভেহিকল সিস্টেম, লং অ্যান্ড শর্ট রেঞ্জ (দীর্ঘ ও সল্প দূরত্বের) এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস টু এয়ার (মধ্যম দূরত্বের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য) মিসাইল শিগরিরই বিমান বাহিনীতে যুক্ত করার কথা বলেন তিনি।
এর আগে নবীন অফিসারদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং পদক, সনদপত্র ও ফ্লাইং ব্যাজ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “বিমান বাহিনী সদস্যদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশ ও জাতির যে কোন প্রয়োজনে ভূমিকা রাখতে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।”
দেশে ও বিদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা, উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে বিমানবাহিনীর অগ্রণী ভূমিকা পালনের কথা উল্লেখ করেন প্রধামন্ত্রী।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিমান বাহিনীর ‘তাৎপর্যপূর্ণ অবদান’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমান বাহিনী একাডেমির জন্য বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হলে বিমান বাহিনী একাডেমির কর্মপরিধি বৃদ্ধিসহ প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়বে।
সম্প্রতি বিমান বাহিনীতে কে-এইট ডব্লিউ জেট ট্রেনার, ওয়াই এ কে-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান ও এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান সংযোজিত হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ অফিসারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “বিমান বাহিনী একাডেমি থেকে যে মৌলিক প্রশিক্ষণ তোমরা গ্রহণ করেছ, কর্মজীবনে তার যথাযথ অনুশীলন ও প্রয়োগের জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকবে।”
সততা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তোমরা নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলবে, যাতে তোমরা দেশ ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পার।
“আমি আশা করি, দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এবং পবিত্র সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তোমরা বাংলার আকাশ মুক্ত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংল্পবদ্ধ থাকবে।”
ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দক্ষতা অর্জনে বিমান বাহিনীর এই অফিসাররা সর্বদা সচেষ্ট থাকবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাপ্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “মনে রাখবে, ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি।
“নিজেদের কখনই সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাববে না। তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সব সময় চেষ্টা করবে।”
বিমান বাহিনীর উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও বলেন শেখ হাসিনা।
“স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার জন্য জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক কৌশলগত দিক বিবেচনায় রেখে তিনি একটি আধুনিক বিমান বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।”
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে সে সময়কার অত্যাধুনিক মিগ-২১ জঙ্গী বিমান, এমআই-৮ হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন, এএন-২৪ পরিবহন বিমান এবং রাডার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযোজন করেন।
তার কন্যা বলেন, “১৯৭৫-এ জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৯৬ সালে আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে কেউ কোন কার্যক্রম গ্রহণ করেনি।”
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চতুর্থ প্রজন্মের অত্যাধুনিক মিগ-২৯ জঙ্গী বিমান, বড় পরিসরের সি-১৩০ পরিবহন বিমান এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার সংযোজন করার কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতির পিতার প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে আমরা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন করি। এই গোলের আলোকে আমরা ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীতে সংযোজন করেছি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ বিমান, পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার।”
প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে বিমান বাহিনী অচিরেই অত্যাধুনিক, পেশাদার ও চৌকস বিমান বাহিনী হিসেবে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাপ্রকাশ করেন।
কুচকাওয়াজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে নিজের আনন্দের কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের এই কমিশনপ্রাপ্তি বর্তমান সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের দৃঢ় নীতিরই প্রতিফলন।
“আমরা বিশ্বাস করি, জাতীয় অগ্রগতিতে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এজন্য সশস্ত্র বাহিনীতেও নারীদের ব্যাপকহারে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
সম্প্রতি বিমান বাহিনীর দুই নারী পাইলট জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের জন্য কঙ্গোতে গিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজে ৭৪তম বাফা কোর্সে ৬৮জন ফ্লাইট ক্যাডেট এবং ডিরেক্ট এন্ট্রি ২০১৭ কোর্সের ১১ জন সহ মোট ৭৯ জন কমিশন লাভ করেছেন। এর মধ্যে ১৩ জন মহিলা ক্যাডেটও কমিশন লাভ করেছেন।
ফ্লাইট ক্যাডেট মির্জা মো. জুবায়ের হোসে ‘সোর্ড অফ অনার’ এবং ফ্লাইট ক্যাডেট শাহরিয়ার তানজীম ‘কমান্ড্যান্টস ট্রফি’ পেয়েছেন।
উড্ডয়নে সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট মো. জুবায়ের হোসেন ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ট্রফি’ এবং গ্রাউন্ড ব্রাঞ্চে সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট এফ এম শহীদুল ইসলাম সুজন ‘বিমান বাহিনী ট্রফি’ পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ৭৯জন নবীণ অফিসারকে ফ্লাইং ব্যাজ পড়িয়ে দেন; প্রধানমন্ত্রী ফ্লাইপাস্ট দেখেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছালে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, একাডেমির কমান্ড্যান্ট এয়ার কমোডর এ এস এম ফখরুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
সূত্র: বিডিনিউজ















