মুনজের আহমদ চৌধুরী: একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে থেকে বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রাখায় দেশের বিশিষ্ট ১২ ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। খবরে আরো জানা গেছে, শিগগিরই তাদের নামে গেজেট জারি করা হবে। তারা হলেন, বর্তমান যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ড. এনামুল হক, দৈনিক মানবকণ্ঠের সাবেক সম্পাদক প্রয়াত জাকারিয়া চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজিউল হাসান, দেশের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ চৌধুরী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, পাট ব্যবসায়ী আবুল খায়ের নজরুল ইসলাম, যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট মাহমুদ আব্দুর রউফ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং হবিগঞ্জ জেলা আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর আফরাজ আফগান চৌধুরী।
উল্লেখ্য, প্রবাসে থেকে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার জন্য এর আগে ২০১৯ সালে নরসিংদীর আজিজুল হক ভূঁইয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এ তালিকাকে অসম্পুর্ন বলছেন এখানকার মুক্তিযুদ্ধের জীবিত ও এখনো সক্রিয় সংগঠক,
বাংলাদেশী কমিউটিতে বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যারা কাজ করছেন,তারা।
এই যে যাদের নাম এই তালিকায় আছে,তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন ৭১ সালে বিলেতে চাকুরী করতে বা পড়তে মাত্র এদেশে আসা লন্ডন প্রবাসী।
এই তালিকায় খুব আশ্চর্যভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিলেতের প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির সেই সব মানুষদের যারা তাদের সাত দিন ৪০ ঘন্টা কাজের পুরো মজুরী তুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার ফান্ডে। সুদূর ওল্ডহাম,ম্যানচেষ্টার থেকে বাস ভর্তি করে সেই সময়কার হাজারো বাংলাদেশী গার্মেন্টসকর্মী শরীক হতেন লন্ডনের ট্রাফলগার স্কোয়ােরের বিক্ষোভে,বিভিন্ন কর্মসুচীতে।
ছিলেন এ কমিউনিটির নারীরা। যারা সংসার,সন্তানের দুধের পয়সা বাঁচিয়ে সেই টাকা একসাথে করে তুলে দিয়েছিলেন এখানকার হাজারো গৃহবধু। বার্মিংহামে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জগলুল পাশার স্ত্রীর বদরুন নেসা সহ অনেক নারীরা সমাবেশে নিয়মিত বক্তব্য দিয়েছেন,হাতে লিখে তৈরী করেছেন ফেষ্টুন,ঘরে ঘরে তৈরী করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সেই পতাকা আর ফেষ্টুন নিয়ে মিছিল সমাবেশ হয়েছে।
ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে গত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন ড রেনু লুৎফা। এই লেখক বলেন,কবীর চৌধুরী,আতা খান,বার্মিংহামের টনি হক, আফরোজ মিয়া,খলিলুর রহমান,সবুর চৌধুরী,জমসেদ মিয়া,সৈয়দ আবদুর রহমান,ওয়াতির আলী মাষ্টার,শাহ নুরুল ইসলাম, কভেন্ট্রির সিতু মিয়া,যার সভাপতিত্বে আবু সাঈদ চৌধুরী একশন কমিটির ঐতিহাসিক সভাটি করেছেন তাদের নাম এ তালিকায় না দেখে বিস্মিত হয়েছি,হতাশ হয়েছি। ইতিহাসে বার বার স্বীকৃত মহান মুক্তিযোদ্ধের প্রবাসী সংগঠকদের এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে প্রবল অবহেলায়,নিদারুন লজ্জায়।
ব্রিটেনে বর্নবাদ বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক লোকমান উদ্দীন বলেছেন,কিছু ঘটনা অনেক লেখাতেই সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
আজ যাদের নাম সরকারী তালিকার সুত্রে আলোচনায় এসেছে সেই একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার্থে আসা তাদের প্রায় সমসাময়িক ড. কাজী জাফরুল্লাহ,মওদুদ আহমদ সহ ৯০ শতাংশ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন। ভুমিকা রাখেন।
তারপরও ৭১ সালে ট্রাফলগার স্কোয়ারে,লন্ডনে বা লন্ডনের বাইরে পাকিস্তান রক্ষার নামে পাকিস্তানীরা বেশ কয়েকটি বড় সভা সমাবেশ করেছে। সেই সব সভা সমাবেশে বাংলায় লেখা ব্যানার ফেষ্টুন নিয়ে কিছু বাঙালী তাদের সভা সমাবেশে সদলবলে যোগ দিয়েছেন,সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। এসব ফুটেজ,ছবি এখনো প্রমান হিসেবে আছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে যে তহবিল গঠনের কমিটি করা হয় সে কমিটির কোষাধক্ষ্য ছিলেন হাফিজ মজির উদ্দীন আহমেদ। পুর্ব লন্ডনের চার নাম্বার হ্যাসেল ষ্টিটের তার বাড়িতেই এ কমিটির মিটিং হত।
এ কমিটির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে ব্রিটেনের সে সময়ের প্রখ্যাত আইনজীবি টমাস উইলিয়ামকে আইনজীবি হিসেবে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধেও ইউকে সংগ্রাম কমিটির ট্রেজারার মজির উদ্দীন সহ পাচঁ জনের একটি টীম করে সম্পুর্ন নিজেদের ব্যাক্তিগত অর্থ নিয়ে ভারতের বাংলাদেশ ঘেষা করিমগঞ্জে যান। খাবার,অর্থ সাহায্য নিয়ে শরনার্থীদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মরহুম এম এ জি ওসমানীর নির্দেশে ট্রাক ভরে ভরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বস্ত্র,জুতা সহ অন্যান্য সামগ্রী সর্বাধিনায়কের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করেন। এমন মানুষের নামগুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত তালিকায়।
সেই সময়কার প্রায় ৯০ ভাগ বিলেত প্রবাসীই ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের। বিলেতে সিলেটী কমিউনিটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ের নাম মুক্তিযুদ্ধ।
বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে নামগুলি বার বার ইতিহাসের স্বর্নোজ্জল ইতিহাসে উঠে এসেছে তাদের প্রায় সবার নাম এ তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। লন্ডনে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবন,হাইকমিশনারের বাসভবন কেনা হয় মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিলেত প্রবাসীদের সহযোগীতা তহবিলের অর্থ থেকে।
বার্মিংহামের জগলুল পাশা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে গঠিত কমিটির সভাপতি। তার কমিটির সেক্রেটারীর নাম আসলেও সভাপতির নাম আসেনি।
টনি হক মুল নেতৃত্বের একজন ছিলেন। ট্রাফলগার স্কয়ারের সমাবেশেও ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়া একমাত্র বাংলাদেশী ছিলেন টনি হক।
২৮ শে মার্চ বার্মিংহামের স্মলহিত পার্কে দশ থেকে ১৫ পনের হাজার মানুষ জড়ো হন। বাংলাদেশের বাইরে প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয় বার্মিংহামে। পাকিস্তানীদের সাথে কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়। কয়েকজন জেলেও যান।
২৮ শে মার্চ স্মরন কমিটি এখনো প্রতি বছর দিবসটি পালন করে,অবদান রাখাদের স্বীকৃতি সংবর্ধনা দেন।
সেই সময়কার প্রায় ৯০ ভাগ বিলেত প্রবাসীই ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের। বিলেতে সিলেটী কমিউনিটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ের নাম মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সাল বা তার আগে পরে বিলেতে বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা ছিল বার্মিংহাম,ওল্ডহাম কেন্দ্রীক। এ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করতেন কয়েক হাজার বাংলাদেশী।
১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে বার্মিংহাম ১৫ নম্বর ডাউন স্ট্রিটের আস্টনে ‘ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট’ নামে ৩০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। সবার সম্মতিক্রমে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মরহুম আব্দুস সবুর চৌধুরী। আর সেক্রেটারি নির্বাচিত হন মরহুম আজিজুল হক ভূঁইয়া। এই ফ্রন্টের মুখপত্র ছিল বিদ্রোহী বাংলা নামে একটি প্রকাশনাও।
৪ মার্চ রাতে কোচ বার্মিংহাম থেকে লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে প্রবাসীরা হাইকমিশন কার্যালয় ঘেরাও করে পাকিস্তানি পতাকা ও স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার প্রতিকৃতিতে আগুন দেন। ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি পাকিস্তানের সেসময়কার হাইকমিশনার সুলেমান আলীর হাতে তুলে দেয়া হয়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী সাহসী বাঙালিরা কমিটির নেতৃত্বে সভা, মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিদ্রোহের এ বিস্ফোরিত আগুনটি অল ইন্ডিয়া রেডিও ও ভয়েস অব আমেরিকা বারবার প্রচার করতে থাকে। সেদিনের পোড়া পাকিস্তানি পতাকাটিই ছিল বিবিসি সংবাদের অন্যতম হেডলাইন। বিশ্বের আনাচে-কানাচে প্রতিবাদমুখর বাঙালিরা একযোগে জেগে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ঢেউটি আছড়ে পড়ে সুদূর বিলেতেও। ৭ মার্চ ডাকা সর্বদলীয় সভায় প্রায় ১০ হাজার বাঙালি জড়ো হন। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ সভায় যোগ দেওয়া মানুষেরা পুনরায় পাকিস্তান হাইকমিশন ঘেরাও করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তিন ঘণ্টাব্যাপী যানজটে বন্ধ থাকা সেন্ট্রাল লন্ডনের আটকে পড়া পথচারীরা বিন্দুমাত্র অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেনি সেদিন।
তৎকালীন মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে বলা হয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর লন্ডনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সমাবেশ। ২৭ মার্চ হাজার হাজার স্বতঃস্ফূর্ত জনতার পদচারণায় ভরে ওঠে বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্ক। অতি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থেই লিবারেশন ফ্রন্টকে বিলীন ঘোষণা করে মরহুম জগলুল হক পাশাকে প্রেসিডেন্ট ও পূর্বোক্ত সেক্রেটারিকে বহাল রেখে গঠন করা হয় বাংলাদেশ অ্যাকশন কমিটি। কমিটির প্রতি দিনের কার্যক্রমে ব্যয়িত অর্থের হিসাবপত্রের প্রকৃত বিবরণীটি ঠিকভাবে পাওয়ার উদ্দেশ্যে মোহাম্মদ ইসরাইলকে নতুন কমিটির নির্দেশিত অডিট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা হয়।অ্যাকশন কমিটি ৫০০ পাউন্ড ব্যয়ে ব্যারিস্টার কিউ সি উইলিয়ামসকে পাকিস্তানে পাঠায়।সব অ্যাকশন কমিটির কার্যক্রম একত্রে পরিচালনা করতে মরহুম বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট ও আজিজুল হককে পুনরায় সেক্রেটারি পদে নিয়োগ দিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি ২৪ এপ্রিল কভেন্ট্রিতে গঠন করা হয়।
অ্যাকশন কমিটি থেকে মোট ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৫৬ পাউন্ড চাঁদা তুলতে সমর্থ হয়। এ থেকেই কমিটি পরিচালনা বাবদ ৩৩ হাজার ২১২ পাউন্ড ব্যয় করা হয়। অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসরাইল সে সময় পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিবরণীটি বাংলাদেশ ফান্ডের হিসাবরক্ষক জেনারেল কাজী মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে মানসিকভাবে চাঙা রাখতে বিপুল ভূমিকা রাখেন। একটা কথা হয়ত অনেকেই জানেননা যে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বৈদেশিক মুদ্রা গিয়েছিল ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের তোলা চাঁদার অর্থ।” ব্রিটেন থেকে চাঁদা হিসাবে তোলা তিন লাখ ৯২ হাজার পাউন্ড তোলা হয়েছিল যা স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল।
শুধু বিলেতের বাংলাদেশীরা নন,রজার গোয়েনের মত ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরাও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে মিছিল সমাবেশে অংশ নেন,সেই সংগ্রামে,পাকিস্তানীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হন। ব্রিটিশ গনমাধ্যম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বড় অবদান রাখে।
কবীর চৌধুরী,আতা খান,বার্মিংহামের টনি হক, আফরোজ মিয়া,খলিলুর রহমান,সবুর চৌধুরী,জমসেদ মিয়া,সৈয়দ আবদুর রহমান,ওয়াতির আলী মাষ্টার,শাহ নুরুল ইসলাম, কভেন্ট্রির সিতু মিয়া এই নামগুলি বাদ পড়েছে। আরো নাম আছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু লন্ডনে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় লন্ডনে অবস্থানরত সিলেটিদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে এসব প্রবাসীদের নাম। বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো আজও স্মরণে আছে প্রবীণ প্রবাসীদের।
একজন মানুষ, একজন সংবাদকর্মীর পক্ষে আট লাখ মানুষের,কমিউনিটির অতি জরুরী সকল ইস্যু নিয়ে তথ্যপুর্ন এবং পুরোপুরি পেশাদার দৃষ্টিকোন থেকে লেখা বা তাৎক্ষনিকভাবে বলা শুধু কষ্টসাধ্য নয়,রীতিমত দুস্কর একটা ব্যাপার। আমি ক্লান্ত। লেখালেখি,কমিউনিটির পেছনে সময়ের অপচয় করে জীবন জীবিকার জন্য খুব প্রয়োজনীয় সময়ের যোগাড় করা কষ্টকর হয়ে যায়।
এ জন্য ইস্যুটি নিয়ে লিখবার আগে তিনদিন অপেক্ষায় ছিলাম,যদি কেউ একজন মোটামুটি একটা লেখাও লিখেন,যাতে পুরো বিষয়টা উঠে আসে। সেটা হয়নি বলেই তাড়াহুড়োয় লেখাটা লিখতে বসা।
বিলেতে বাংলাদেশীর লাঙ্গল টু লন্ডন বলে যে ব্যাঙ্গ করা হয়,সেই লাঙ্গল ঠেলে লন্ডনে আসা গর্বিত মানুষদের ইতিহাস। যারা বিলেতে বাংলাদেশীদের সমাজ তৈরী করেছেন পঞ্চাশের দশকের শুরুতে। তারা গার্মেন্টেসে শ্রমিকগিরি করেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বিলেত থেকে আন্দোলনে,সংগ্রামে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন সেই শ্রেনীর মানুষরা। যারা এদেশে মুক্তিযুদ্ধের অন্তত দশ পনেরো বছর আগে এ কমিউনিটিতে বাস করতেন,সেটেল ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে মাসের পর মাস কাজ না করে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের শ্রম,অর্থদিয়ে ,পাকিস্তানীদের সাথে মামামারি,হামলার শিকার হয়েও মাঠে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে এদেশ থেকে গিয়ে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। হাফিজ মজির উদ্দীনের মত ব্যাক্তিরা পাচ দশ করে মিলে নিজেদের টাকা নিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে সরাসরি তুলে দিয়েছেন। এখানে সভা সমাবেশ বিক্ষোভের আয়োজনে যারা অগ্রভাগে ছিলেন,তাদের শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষ ছিলেন এ কমিউনিটির স্থায়ী বাসিন্দা।
আর সরকারী তালিকার প্রথম নামটি সুলতান শরীফের। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি এখানে একশন কমিটির বেতনভুক্ত অফিস বেয়ারার হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে এদেশ থেকে অসামান্য অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ধরলেও একাধারে গত ৫০ বছর ধরে বিলেতের রাজনীতি,কমিউনিটিতে বিতর্কের উর্দ্ধে থাকা একজন রাজনৈতিক নেতা তিনি। বিলেতের বাংলাদেশী রাজনীতির প্রবীনতম রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এখনো তার দল রাজনীতির মধ্য দিয়ে সমাজকে সার্বক্ষনিকভাবে সময় দিয়ে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহেনা;এ দুজনের কাছেই তিনি পরম আস্থার নাম। বিএনপি আওয়ামীলীগের মতো রাজনৈতিক দলে বিলেতে তার চেয়ে সচ্ছ, প্রবীন ও এই বয়সেও তুমুল সক্রিয় কোন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব এদেশে আর কেউ নেই।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়া একটি দেশের মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে থেকে যারা বৃহত্তম লড়াই করেছেন তারা এই ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটি।
বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগ্রামী সংগঠক তোজাম্মেল হক টনি,২৮ শে মার্চ
বার্মিংহাম উদযাপন পরিষদের সেক্রেটারী কমরেড মসুদ আহমেদের মতন অভিভাবকদের চোখে এই অসম্পুর্ন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তালিকা নিয়ে যে বেদনা পড়েছি,তা আমাকে বিষাদগ্রস্থ করেছে।
রাজনৈতিক একটি সরকারের তালিকায় রাজনীতি,দলীয় বিবেচনার বাইরেও বিলেত প্রবাসী কমিউনিটির হতাশ হবার যথেষ্ট কারন রয়েছে। তালিকাটি সরকার পুনাঙ্গ আকারে প্রকাশ করুক,এটা সরকারের কাছে প্রতাশা নয় দাবী।
কারন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ কয়েক বছর ব্রিটেন প্রবাসী ছিলেন।
এদেশে কমিউনিটির জন্ম উত্থানের নায়ক কারা,মুক্তিযুদ্ধে বিলেত থেকে কারা কতটা ভুমিকা রেখেছেন নানা কারনেই তাঁর জানা। বঙ্গবন্ধু ছোট কন্যা শেখ রেহেনা পচাত্তরের পর থেকে ব্রিটেনেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করেছেন। তাই দল,রাজনীতির উপর আস্থা হারানো মানুষেরও সরকার,সরকারী দল আওয়ামীলীগ নয় জাতির জনক স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার কাছে; এই দুজন ব্যাক্তিমানুষের কাছেও কমিউনিটির বর্ষীয়ান জীবিত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মুরব্বীদের একটা প্রত্যাশার জায়গা এখনো রয়ে গেছে। কেননা, ৬৯ থেকে মুক্তিযুদ্ধ আর এদেশে বর্নবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্তত শিরোনামের মুখগুলি সম্পর্কে অন্তত এ দুজনার জানা বলেই হতাশা টুকু।
লেখকঃ যুক্তরাজ্যে কর্মরত সাংবাদিক
লন্ডন ২৩ শে জুন।















