গ্রীষ্মের ছুটিতে ইংল্যান্ডের সুন্দর শহর গুলিতে ঘুরে বেড়ানোর অন্যরকম অভিজ্ঞতা  ও ভিন্ন রকম আনন্দ

327

মো: রেজাউল করিম মৃধা : ছুটি মানেই আনন্দ, সেই আনন্দের সাথে বাড়তি যোগ হয় যখন ঘুরে বেড়ানো হয় এক শহর থেকে অন্য শহর। সাগর থেকে নদী, খাল বিল থেকে লেক, পানি থেকে সমতল । সমতল থেকে পাহাড় । পাহাড়ের ছোটবড় সারিসারি গাছপালার মাঝদিয়ে আঁকা বাঁকা সুরু রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেসে, উঁচু নিচু ভয়ংকর পথ দিয়ে গাড়ী চালিয়ে চালিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহর ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ বা অভিজ্ঞতা সত্যি অপুর্ব ।
ভ্রমন মানেই ছুটে চলা নিরুদ্দেশে। হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির মাঝে। নিয়ে আসা নতুন অভিজ্ঞতা।কর্ম ব্যস্ততা কোলাহল থেকে দুরে মুক্তমনে শান্তির নি:শ্বাস ফেলা।গাড়ীর এম ও টীর মত শরীর মনকে নতুন ভাবে উজ্জিবীত করা।
এবার ছুটিতে বেড়িয়ে পরলাম। সেই কবিতাটা কে বুকে ধারন করে।
থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে।
দেখবো এবার জগতটারে।
——- ——- —— ।
না জগত না হলেও ইংল্যান্ডের কিছু শহর, কিছু সুন্দর স্থান । পাহাড় , নদী , লেক, সাগর কিম্বা চিড়িয়াখানা । যে কথা সেই কাজ। আমার স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ের সাথে পরামর্শ করি। কোথায় যাবো? কি কি দেখবো? কোথায় কোথায় থাকবো? কিভাবে এবং কবে কোথায় যাবো তার একটি পরিকল্পিত ছক তৈরী করে সেই অনুযায়ী বেড়ীয়ে পরি ।
পহেলা আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১৯ থেকে ।দশ দিনের ছুটি। এরই মাঝে পরিকল্পনা অনুযায়ী হোটেল বুকিং করা হলো , সেই সাথে আমার কিছু বন্ধুদের সাথেও ফোনে যোগাযোগ করলাম। যে শহরে যাবো সে শহরে পরিচিত কিছু বন্ধু আছে। বেড়ানো এবং বন্ধুদের সাথে দেখা আনন্দের সাথে যোগ হয় আরো আনন্দ। সাংবাদিকতা ও সামাজিক জীবনে অনেক বন্ধু ও আপন জন আছেন। আপন ভাই এর চেয়ে অনেক আপন। তাছাড়া দীর্ঘ দিন পর দেখা । পুরাতন স্মৃতি কে মনে করিয়ে দেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকালে ৮.০০ টায় বেড়িয়ে আল্লাহর নামে। উদ্দেশ্য লিভেরপুল। কেননা ছেলে এহসানুল লিভার পুল ফুটবল ক্লাবের সমর্থক তাই এখানে আসা । অবশ্য আগেই ফোনে কথা হয়েছ সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে এরা শুধু আমার নত আপনাদের ও সবার পরিচিত। সাংবদিক আজাদ ভাই , হোসেন ভাই এবং সাদী ভাইর সাথে।
লন্ডন থেকে লিভার পুল মাঝে বিরতীর পর প্রায় ৫ ঘন্টা পরে এসে পৌছলাম। এসেই সোজা সমুদ্র পাড়ে । কিন্তু আবহাওয়া অনুকুলে না থাকাত গোসল করা না হলেও পানিতে দেরী হয়নাই সমুদ্রের পাড় ঘেয়ে কাঁশবনের ছবি তোলার অন্য রকম অনুভুতি ।
এর পর দুপুরের খাবার খেয়ে চলে গেলাম এহসানের পছন্দের লিভার পুল ফুটবল ক্লাবে। বিশাল স্টেডিয়ামের সামনে দাড়িয়ে ছবি তোলা । ঘুরে দেখা ক্লাবের বিভিন্ন অংশ। মনে হলো এহসানুল পেয়েছে মনের তৃপ্তি।আমাদের ও ভালো লাগলো ছেলের তৃপ্তি দেখে। এর পর চলে গেলাম হোটেলে । হোটেলে বিশ্রাম নিতে না নিতেই ফোন করলেন আমার প্রয় সাংবাদিক বন্ধু সাদী ভাই । অবশ্য এর আগেও কথা হয়েছে । দুপুরে ব্যাস্ত থাকবেন। কেননা বিয়ের দাওয়াৎ আছে। বিশ্রাম না নিয়েই আবার বেড়িয়ে পরলাম স্বপরিবারে। সিটি সেন্টার থেকে তুলে নিলাম সাদী ভাইরে। এরপর কুইন্স টানেল পার হয়ে অপর প্রান্তের আর একটি সমুদ্র পারে। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সমুদ্রে ভাটা পরে পানি চলে গেছে অনেক অনেক নিচে। সদ্য ভেজা পানিতে বালু গুলি লেগে আছে। যেনো ঝিরঝির বাতাসে নড়াচড়া না করে তৃপ্তির সাথে ঘুমিয়ে আছে পরম আদরে। আর আমরা হেঁটেহেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছি সাদী ভাইর সাথে কথার মালা গেথেগেথে। পরন্ত বিকেলে সমুদ্রের পাড়ে হেঁটেচলা আর তখন মনে পরে সেই গান
এই তো এই নদীর ও পাড়ে বসে গান শোনা।
একটি দুটি কথা মাঝ মাঝে আনমনা।
—- —— ———-
পাড় থেকে উঠে এসে আইসক্রীম শিশুদের যেনো আনন্দের শেষ নেই। এবার ফোন এলো সাংবাদিক আজাদ ভাইয়ের। তিনি অপেক্ষা করছেন সিটি সেন্টারের অপর পাশে। ফিরে চলা আজাদ ভাইর কাছে । আজাদ ভাই সহ ঘুরে ঘুরে দেখা লিভার পুল সিটি সেন্টার ।আপনারা তো জানেন মহিলাদের যত পোশাকই থাকুক নতুন কিছু দেখলে কিছু কিনতে হবে। আমার ক্ষেত্রে তার ব্যাতিক্রম নয়।
আবার ঘুরে ঘুরে দেখা এবার নানদুছ চোখে পরতেই শিশুদের খিধে যেন বেড়ে গেলো কয়েক গুন।এ নানদুছে লম্বা লাইন । অপেক্ষার পর খাবার পাওয়া যেন স্বাদ বেড়ে গেলো। সাদী ভাই বিল দেওয়ার সুযোগটা নিয়ে নিলেন। এর পর আবার সিটি সেন্টারেপ অপর পাশে সমুদ্রের সাইট অতি চমৎকার । গোছানো ছিমছাম এ শহর । ডগ , মিউজিয়াম, লিভারপুল আই সহ অন্যান্য স্থাপনা সত্যি মনোমগ্দময় । দেখতে দেখতে অনেক রাত । রাত এগারোটায় সাংবাদিক বন্ধু হোসেন ভাইর বাসায় দাওয়াৎ । কেননা হোসেন ভাই নিজের টেকওয়ে রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে তবে আসবেন । যে কথা সেই কাজ চলে গেলাম হোসেন ভাইর বাসায় খাওয়া দাওয়া শেষে । গল্প জমে উঠার আগেই বিদায় নিতে হলো। ধন্যবাদ সাদী ভাই আজাদ ভাই হোসেন ভাই এবং ভাবী কে এদের আদর আপ্যায়নে আমরা সত্যি কৃতজ্ঞ। বিদায় নিয়ে চলে গেলাম হোটেলে কিন্তু রয়েগেলো অনেক স্মৃতি।
পরদিন সকাল হতে না হতে রেড়ী হয়ে গেলাম । সবাই তৈরী হলো অতি তাড়াতাড়ি কেননা আমরা যাবো আমাদের নির্ধারিত স্থান অতি সুন্দর শহর লেক ডিস্টিক । অনেকটা স্বপ্নের মত । কখন যাবো? কতক্ষনে যাবো মনকে যেনো বুঝাতে পারছিলাম ।
হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে হোটেল থেকে বিদায় নিয়ে লাগেজ নিয়ে উঠে গেলাম গাড়িতে। পোস্ট কোর্ড দিয়ে । বিসমিল্লাহ হে মাজরেহা ওয়া মোরছাহা
ইন্নাহ রাব্বি লা গাফুরুর রাহিম বলে। গাড়ী চালানো শুরু করলাম।
লেক ডিস্ট্টিক বা লেক ল্যান্ড ও বলা হয়।উত্তর পশ্চিম ইংল্যান্ড
হোয়াইট হোরস ইন,হোটেলের ঠিকাননাা
গাড়ী চলছে । কিছুক্ষন পরই মটোরওয়ে উঠে গেলাম । মটোরওয়ে পার হয়ে যখন লেক ডিস্ট্রিক রাস্তা ধরছি তখন ই অন্যরকম সুন্দর্য চোখে পরতে লাগলো। সরিসারি গাছপালা উঁচু নিচু পথ কখনো পাহাড়ের কোল ঘেঁসে কখনো লেকের ধারে। নতুন নতুন স্থান, নিদর্শন দেখতে দেখতে চলে এলাম স্বপ্নের সেই লেক ।
Windermere পার হয়ে Ambleside লেকের গেটে।
এতো সুন্দর মনোরম দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি। গাড়ী পার্কিং করে। ওয়াস রুমে থেকে এসে তবে ভাংতি পয়সা না হলে ওয়াস রুমে যেতে পারবেন না।
হাল্কা নাস্তা সেরে গেলাম টিকিট কাউন্টারে। টিকিট কেটে নিলাম। তখনো প্রায় ১৫ মিনিট সময় বাকী স্টিমার র আসতে তাই শুরু হলো ছবি তোলা। সব বয়সী লোকের অবস্থান এখানে । নৌযান আসতেই সবাই সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো হলে । নৌযানে উঠতেই মনটা ভরে গেলো আনন্দে। প্রথমে স্টিমারেপ একেবারে সামনে । বেশ কিছু সময় কাটালাম এর পর উপরে নিচে এবং একে বারে পিছনে ঘুরে বেড়ালাম কেননা দীর্ঘ তিন ঘন্টার পথ। অবশ্য পথে আরো দুটি স্টপে যাত্রী উঠা নামা করলো । প্রতিটি স্টপেই আছে আলাদা বৈশিষ্ট, আলাদা সৌন্দর্য । এসৌন্দর্যে আত্ব্যহারা হয়ে। কখনো ছবি , কখনো সেলফি, কখনো লাইফ সে এক অন্য রকম অনুভুতি।
ততক্ষনে একটি মেসেস এলো হোটেল থেকে। কেননা দুপুর দুটায় ইন করার কথা কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে টেরই পাইনি। লাইফ করতে করতে মোবাইলের লাইফ শেষ। যোগাযোগ বিছিন্ন।
এবার আমরা লেকের মাঝখানে। ঘুরে ঘুরে এসে ঘাটে ভিরলো তরি।সবার সাথ আমরা ও নেমে পড়লাম। আবার নাস্তা করে ছুটে চললাম হোটেলের উদ্দেশ্য। এবারের রাস্তা টি আরো চমৎকার। যাচ্ছি তো যাচ্ছি নিচু উঁচু আঁকা বাঁকা পথ। হোটেল খুঁজে পেতে কস্ট না হলে ও গাড়ীর উঠতে বেশ কস্ট হলো কেননা বেশ উঁচুতে এহোটেল টি । গাড়ী পার্কিং করে কিছুটা দম নিয়েই পিছিপ সনে যেয়ে পেইমেন্ট করার পর দরজা কোর্ড নাম্বার দিয়ে দিলেন। রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে আরলি ডিনার করে নিলাম। কেননা সবাই বেশ ক্লান্ত । খাবার নিতে নিতেই রিছিপসনে আলাপ করে নিলাম কাছে দেখার কি আছে । জানলাম কাছেই ঝড়নার পাহাড় টি খুব কাছে যদিও ক্লান্ত কিন্তু ঘুরতে এসে অলস হলে কি আর চলে? পরন্ত বিকেলে ঝরনা দেখতে বেশী আনন্দময়। তাই আবার ছুটে চললাম পানি ঝরনা দেখতে। খুঁজে পেতে কিছুটা কস্ট হলো। প্রায় সন্ধ্যা নেমে এলো আমরা পাহাড় ঘুরে ঘুরে উপরে উঠতে লাগলাম । এসময় অনেকেই নেমে আসচ্ছেন । উঠতে উঠতে কাছে গেলাম ঝরনার পানি পরার শব্দে মনটা আনোন্দিত হতে লাগলো। ছবি তোলা, লাইফ দেওয়া হচ্ছে। দু পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ঝরনার পানি ঝরছে তার উপর দিয়ে ছোট্ট পুল বা ব্রিজ করে দিয়ে যাতে এপার ওপার দুপার থেকে পর্যটকরা ভালো ভাবে দেখতে পারেন। ব্রিজের পাশেই বড় গাছ কেঁটে ফলে রাখা আছে যাতে ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নিতে পরেন।
ততক্ষনে পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বেলা গেলো ঐ।
কোথা গেলো হাঁস গুলি ধৈ ধৈ।
— — — —-
সন্ধ্যার সাথে সাথে সবাই ছুটে চলছে যার যার গন্তব্যে। আমরা ও নেমে আসতে লাগলাম তবে আরো একটু সময় যদি পেতাম। না রাত বেশী হলে পাহাড়ে কত কিছুর ভয়। নেমে এলাম একেবারে নিচে যেনো অন্য রকম আনন্দ পাহাড় থেকে পানি নামতে নামতে স্রোত কমে গেছে পাথর আর পাথর একে বেঁকে চলছে পানি এখানে একটি ছোট্ট ব্রিজ । ব্রিজে পাশে পাথর বেঁয়ে ঝরনার পানি যাচ্ছে সেই পাথরে উপরে দাড়িয়ে ছবি তুলতে এবং বসে বসে হাত দিয়ে পানি ধরতেই সমস্ত ক্লান্তি মুছে যায় নিমিষে।
হোটেলে গিয়ে নামাজ শেষে ঘুমের প্রস্তুতি সকালে উঠেই চলে যাবো সর্ববৃহৎ পাহাড়ের চূড়ায়। সবাই ঘুমিয়ে গেলাম । সকালে উঠে হাতমুখ ধুঁয়ে নাস্তা সেরে শুধু একটি কাঁধে ঝুলানো ব্যাগে করে। পানির বোতল আর সামান্য নাস্তা নিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সুরু আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে উঠতে লাগলাম উপরে যতই উঠি পথ যেন শেষ হয়না। হাপিয়ে উঠি। মাঝে মধ্যে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার কিছুটা উঠি।
মনের অজান্তেই গেয়ে উঠি ।
এপথ যদি না শেষ হয় , তবে কেমন হতো ।
দীর্ঘ প্রায় দুঘণ্টার ও বেশী সময় লাগলো উপরে উঠতে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। হাত দিয়ে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করে। খোলা আকাশের নিচে দুর্বাঘাসের উপর সুয়ে থাকতে কার না ইচ্ছে করে।ঘুরে ঘুরে ডিগবাজি খেতে ও মন চায়।
কিন্তু পাহাড়ে উঠতে গিয়ে আমার হলে মহা বিপদ ছেলে মেয়ে উঠে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। প্রিয়তমা স্ত্রী পরে রয়েছে নিচে । আমি আছি মাঝে। ছেলে মেয়েরে বলি আস্তে উঠো আর মাঝে মধ্যে স্ত্রী কে হাত ধরে উঠাতে হয়। পথচারী অনেকে উঠছেন আবার অনেক নামছেন।সবাই ক্লান্ত অবশ্য উপরে উঠার পর ক্লান্ত যেনো কোথায় উধাও হয়ে গেলো। পানি আর হাল্কা নাস্তাও শরীর কে একেবারে তরতাজা করে ফেললো।
উপর থেকে নিচের বাড়ী ঘর গুলি অতি ছোট মনে হয়। আঁকা বাঁকা রাস্তা গাড়ী গুলি কে অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় গুলিকে অনেক অনেক সুন্দর মনে হয়। আবহাওয়া ছিলো অতি চমৎকার। কিছুটা সময় অতিবাহিত করে নিচে নেমে আশার পালা। কেউ নামছেন কেউ উঠছেন। এর যেন শেষ কোথায় আমরা কেউ জানিনা। তবে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের ভেলায় ভেসে যাওয়ার সেই স্মৃতি রয়ে যাবে মনের মাঝে অনন্তকাল।
ক্লান্ত অবসন্ন দেহ নিয়ে হোটেলে এসে সাওয়ার শেষে রেস্টুরেন্ট এ বৃটিশ খাবার কারো যেনো তৃপ্তি হচ্ছেনা যদি ও সম্মপ্রতি বৃটিশ হয়েছি স্বপরিবারে তবুও বৃটিশ খাবারে তৃপ্তি মেলা ভার মাত্র দুদিনেই বাংঙালী খারার খুঁচ্ছি। কি আর করা বিকেলে Keswick Town Centre এ গেলাম । চমৎকার সুন্দর শহর। ঘড়ির টাওয়ার, পাশে বিশাল এরিয়া নিয়ে কার পার্কিং রাস্তার দুধারে সারিসারি দোকান পাট। বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট সব দেশের খাবার আছে। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট সাইনবোর্ড দেখেই মনটা ভরে গেল। ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম সবাই বাংলাদেশী। খাবারের অর্ডার দেওয়া এবং খাবার খাওয়ার সময় ছেলে মেয়ের তৃপ্তি দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল। এবার ঘুরতে গেলাম হোপ পার্ক এ পার্কে না এলে সফরটা অপরিপূর্ন থেকে যেতো। অতি চমৎকার। গোছানো, পরিপাটি। কোথাও ছোট ছোট গাছ আবার কোথাও ফুলে ফলে সাজানো। এ পার্ক এ এলে মনটা সুন্দর না হয়ে পারে না। বসার জায়গা পাশদিয়ে ছোট্ট লেক ছোট্ট ছোট্ট ব্রিজ ফুলের গাছ ফলের গাছ এমন বাহারী গাছ আছে যা হয়তো কখনই দেখি নাই। এক কথায় অপূর্ব।

দ্বিতীয় পর্ব
—-////// ——
পরদিন সকালে হোটেল থেকে বিদায় নিয়ে এবারের উদ্দেশ্য Whitehaven town আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই সাংবাদিক সুজাত মুনসুর ভাইর সাথে দেখা করা এবং হুয়াইটহ্যাভেন সহ আরো কয়েকটি শহর দেখা।প্রতিটি শহরেই রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট ও আলাদা সুন্দর্য। যাবার পথেই আরো দুটি শহর দেখে নিলাম। Cockermouth , Maryport , Aspatrain সহ আরো কয়েকটি শহর।
হুয়াইটহ্যাভেন সত্যি এক অপরুপ শহর। একাধারে সমুদ্র , সমুদ্র ডগ যেখানে ছোটবড় সব ধরনের জাহাজ এসে নৌঙ্গর ফলে। বিশেষকরে মাছ ধরার ট্রলার বিকেল হতে আসতে থাকে রাত্রী যাপন করে আবার ভোর বেলা চলে যায়। মাছ সহ অন্য মালপত্র উঠানামার ব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো বন্দর।
সাগর কন্যা আমাদের প্রতি বিমুখ ছিলেন। আবহাওয়া ঘন ঘন পরিবর্তন । এই রোদ এই বৃস্টি।
এ সময় এলেন ঐ এলাকার মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান । দুপুরের খাবার শেষে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা বেশ জমে উঠলেও হুজুর কে বিদায় নিতে হলো।ঐ এলাকায় হুজুরদের চলাফেরা ইস্ট লন্ডনের মত নিরাপদ নয় বলে মনে হলো।
এর ই মাঝে সুজাত মুনসুর ভাই ফিরে এলেন কার ছেলে সহ রাকবি খেলা দেখে। এবার আমাদের বাইরে যাবার পালা। আগেই বললাম আবহাওয়া অনুকূলে নয়। তারপর ও বের হলাম । এখানে পাহাড়ের সংখা বেশী বলে মনে হচ্ছে । নেই কোথাও সমতল। গাড়ী উঠছে নামছে ঘুরছে পাহাড়ের কোল ঘেসে। চলে গেলাম ST BEES Beach এ সমুদ্রে পা ভিজানোর আগেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃস্টি শুরু হলো। এর পর গেলাম বৃটেনের বিশিস্ট কৌতুক অভিনেতা মিস্টা বিন এর স্কুল দেখতে। যে স্কুলে তিনি লেখাপড়া করেছেন।এ স্কুল টি দেখার আগ্রহ পর্যটক দের অনেক বেশী। বৃস্টির কারনে গাড়ীতে ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক কিছুই দেখলাম। নতুন জায়গা, নতুন শহর দেখতে ভালোই লাগছে। বাসায় এসে খোস গল্প ভালোই লাগছে। কখন যে মধ্য রাত পার হয়েছে মনের অজান্তেই । কৃতজ্ঞতা সুজাত ভাই , ভাবী, সহ পরিবারের সবাইকে তাদের আপ্যায়নে আমরা মুগ্ধ।
পরের দিন নাস্তা সেরে কিছুটা সময় সমুদ্র পারে ঘুরে এবার ফিরে চলা বারমিংহাম এর উদ্দেশ্য ।পথ মধ্য দেখে নিলাম, Sprinkling Tram, House of Garden,Kendal,Penrith City . তবে ২/৪ দিনে লেক ডিস্টিকট ঘুরে দেখা সম্ভব নয় । বিশাল এরিয়া অনেক কিছুই দেখার আছে। তবে স্বল্প সময় মেইন মেইন স্থান দেখেছি এতেই সান্তনা।
লেক ডিস্টিক থেকে বারমিংহাম দুই আড়াই ঘন্টার পথ। বারমিংহাম দুই বন্ধু গিয়াস উদ্দিন ও মনিরুজ্জামান মনির এর বাসায় বেড়াব প্রথমে গিয়াস উদ্দীনের বাসা আমার বহু পুরানা বন্ধু রোমে এক সংগে ছিলাম বহুদিন।আগেই ফোনে কথা হয়েছে। এছাড়া ও বারমিংহাম এ সাংবাদিক বন্ধুরা আছেন তাদের সাথে ও দেখা হবে। তবে মেইন টারগেট সাফারি পার্ক এ যাওয়া। আমার ছেলে সাফারি পার্ক দেখবে।আমাদের ইচ্ছে।
রাতেই অন লাইনে টিকিট কাটা হলো। পর দিন নয় তার পর দিন । পরদিন বারমিংহাম শপিং এর জন্য গেলাম। পোষাকের দাম লন্ডনের কিছুটা কম মনে হলে। কেনা হলো পছন্দ মত পোষাক। রাতে আবার আর এক বন্ধু মামুনের বাসায় দাওয়াৎ ।
দাওয়াৎ শেষে এবার মনিরের বাসায় গিয়ে গল্প । মনির ও পরিবার সন্তান সহ সাফারি পার্কের অন লাইনে টিকিট কেটে নিলো। অন লাইনে টিকিট কাটলে কিছুটা ডিস্কাউন্ট এবং লাইন দিতে হয় না তাই প্রায় সকলে অন লাইনে টিকিট কাটেন।
বুধবার সকাল রওয়ানা হলাম সাফারি পার্কের উদ্দেশে। বারমিংহাম থেক ওয়েস্ট মিডল্যান্ড সাফারি পার্ক ঘন্টা খানেকের পথ মাত্র।সাফারি পার্ক প্রবেশ বিশাল লাইন অবশ্য ৫/৬ টি কাউন্টার সারি সারি গাড়ী দীর্ঘ অপেক্ষার পর গেটে টিকিট দেখিয়ে প্রবেশ করতেই বিশাল এলাকা গাছ গাছালি মাঝে ফাঁকা বিশাল মাঠ মাঠের মাঝ দিয়ে রাস্তা রাস্তার পাশদিয়ে বন্যপ্রানী অবাধে চলা ফেরা করছে। রাস্তা পাশে নিচু জায়গায় গন্ডার ও অপর পাশে জলহস্তী । হরিণ জেব্রা গাড়ীর পাশে আসছে । গাড়ীর কাঁচ খুলে খাবার দিচ্ছে এরা খেতে আসছে । শিশুরা নিজ হাতে পশুরে খাবার খাওয়াত পেরে আনন্দে আত্বহারা হয়ে যাচ্ছেন।
এর পর বড় মাঠ পেরিয়ে গাড়ী চলছে সামনের দিকে হিংস্র থেকে হিংস্র প্রানী এখানে প্রবেশের সতর্কতা লেখা । গাড়ীর কাঁচ খোলা যাবেনা। আফ্রিকা, আমেরিকা এবং বাংলাদেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। দেখলাম তবে তখন বেশীর ভাগ বসে বসে অথবা মাচায় শুয়ে আরাম করছে। একটু সামনে আফ্রিকার বন্য কুকুরের এক দল ছেড়ে দিল এবং কিছু মাংসের টুকরা যে যার মত দৌড়িয়ে নিয়ে নিল। দৃশ্য সত্যি ভয়ংকর ।
আরো সামনে আরো ভয়ংকর অনেক গুলি গেইট অতিক্রম করে যেতে হয়। হাতে বাম পাশে লোহার বড় বড় খাচায় বসে আছে রয়েল বেংগল টাইগার তখন ও শুয়ে আছে মহা আনন্দে। একটু উপরে উঠতেই আবার চোখে পরলো খোলা মাঠ এখানে গাড়ী গুলি থেমে থেমে চলছে কেননা উট গুলি পাস্তায় নেমে এসেছে পর্যটকরা উটকে খাবার দিচ্ছে আর উট খাচ্ছে সে এক অন্যরকম অনুভুতি।
এরপর কিছুটা বাগ ঘুরে যেতেই হাতিদের অভয় স্থান। এখানে খাবার দেওয়া নিষেধ । তারপর ও হাঁটা চলা দেখতে গাড়ী আস্তে চালানো হচ্ছে। এর পর সবচেয়ে মজা আনন্দ আর ধরে রাখা যায় না। জিরাফ গুলি রাস্তায় অবাধে হেঁটে যাচ্ছে। গাড়ীর কাঁচ নামিয়ে খাবার দিচ্ছে লম্বা গলা গাড়ীর খোলা জানালায় হাত থেকে খাবার নিচ্ছে। সে অনুভুতি আনন্দ ভাষায় বলে বা লিখে বুঝানো যাবে না।
ঘুরতে ঘুরতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত সবাই অনেকটাই ক্লান্ত আর তাই এ পর্ব শেষ করে । গাড়ী পার্কিং এর বিশাল এরিয়া সাথে ওয়াস রুম,বাথ রুম। এবং বসার জন্য চেয়ার টেবিল আছে পাশেই আছে বার সপ। অনেকে নিজেরাই নাস্তা নিয়ে এসেছেন যে যার মত বিশ্রাম নিচ্ছেন।
বিশ্রাম শেষে এবার ছুটে চলা আরো আনন্দের জায়গায় জলজ্ব প্রানি, গিফট সপিং, ফানফেয়ার, সাপ, কছ্ছপ , মাছ, ডলফিন , সি লাইয়ন এর চমৎকার খেলা এবং পাখির কিচির মিচির। পাখির খাচায় ডুকলেই পাখির কিচির মিচির এক অনাবধ্য আবয়ের সৃস্টি হয়।আর পাখিটি যখন হাতে, কাঁধে অথবা মাথায় বসে সে যে কি আনন্দ।কি করে বুঝাই বলে।
মিউজিয়াম ঘুরে ঘুরে দেখা বন্য প্রানী থেকে শুরু করে সব ধরনের ছোট বড় প্রানীর অবিকল রক্ষনাব্ক্ষন সহ ভয়াবহ আওয়াজ মনকে দুর্বল করে তোলে। এর মাঝেও এক অন্য রকমের আনন্দ। ভিতরে লেকের পাসদিয়ে হেঁটে চলা এবং শত শত মানুষের চলা ফেরায় প্রানবন্ত হয়ে উঠে সাফারি পার্ক।
সকলের অপেক্ষা কখন শুরু হবে সি লাইয়নের খেলা।সমনে জলাসয় পরিস্কার নীল পানি অপর সাইটে গ্যালারি কয়েক শত লোকের বসার ব্যাবস্থা।
দিনে মাত্র তিনটি খেলা তাই ঘুরে ফিরে। খেলা দেখার প্রতিক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গেইটের সামনে লম্বা লাইন। আমি আমার পরিবার সহ এবং মনির ভাই তার পরিবার সহ প্রথম সারিতেবসলাম উদ্দেশ্য লাইফ করবো। যে কথা সেই কাজ সো শুরু হলে আমিও লাইফ নিয়ে আছি। চমৎকার সব খেলা । কখনো রিং পরছে কখনো বল খেলছে। আবার অনেক উপর থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পরছে। সত্যি সুন্দর যা হয়তো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । তা একটি জ্বলজ্ব প্রানী করছে। দিন গড়িয়ে সন্ধা এবার ফেরার পালা। ফিরে এলাম। সাফারি পার্ক থেকে তবে স্মৃতি গুলি রয়ে বহুকাল।