একদিকে কাশ্মীরে মোদির দমনপীড়ন; অন্যদিকে বেয়ার গ্রিলসের সাথে তার সাজানো ‘প্রকৃতি প্রেম’

133

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কাশ্মীরের সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়ার প্রতিবাদে সেখানকার বিক্ষোভকারীদের দমনপীড়নের খবর যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রচার হচ্ছিল, তখন ডিসকভারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জঙ্গল অভিযানের গল্প।

বেয়ার গ্রিলসের ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের এ বিশেষ পর্বটির শুটিং হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। তখন পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িবহরে স্থানীয় এক কাশ্মীরি তরুণের হামলায় ৪০ জওয়ান নিহত হন। আর সোমবার কাশ্মীর নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই এ পর্বটি টেলিভিশনে দেখানো হল।-খবর আনন্দবাজারপত্রিকার
‘মানুষ বনাম বন’-এ জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বন ও বন্যপ্রাণীদের চরিত্র, বাস্তুসংস্থানের গল্প বলেন বেয়ার গ্রিলস। এবারের পর্বে তার সঙ্গে ভারতের উত্তরখণ্ডের জিম করবেট জাতীয় উদ্যানে হেঁটে হেঁটে মোদী বলেন নিজের জীবনের নানা গল্প আর দর্শনের কথা। তিনি জানালেন প্রকৃতি সংরক্ষণ ও পর্যটনে জোর দেয়ার কথা।

প্রথমেই মনে করিয়ে দিলেন, বিশ্বের কাছে কেন এটা এত আকর্ষণের জায়গা। প্রথমত, পাহাড়, প্রকৃতি, নদী, হ্রদ, যারা উপভোগ করেন, তাদের জন্য এটা এক শানদার জায়গা।

দ্বিতীয়ত, যারা বনস্পতির বিভিন্ন গুণাগুণ সম্পর্কে আগ্রহী, তাদের জন্যও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র এই বনাঞ্চল।

বেয়ার গ্রিল বললেন, উত্তরাখণ্ডে জিম করবেট জাতীয় উদ্যানে হিংস্র পশু আছে। বাঘ আছে। মোদীর জবাব, আমরা প্রকৃতির সঙ্গে তালমিল রেখে চললে বন্য পশুও কিছু করবে না।

বেয়ার: শৈশব কোথায় কেটেছে?

মোদি: গুজরাটের এক ছোট এলাকায় জন্মেছি। ছোট পরিবারে জন্ম। ভাল ছাত্র ছিলাম না। সাবান কেনার ক্ষমতা ছিল না। বৃষ্টি পড়লে লবণের স্তর তৈরি হত। তা দিয়ে গোসল করতাম। কাপড় কাচতাম। এভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বড় হয়েছি।

পথে হাতির মলের গোলা তুলে মোদিকে শোঁকালেন বেয়ার। বললেন, বেশ টাটকা। এর গন্ধ মশা আসতে দেয় না। আগে এক বার এর রস চিপে তেষ্টা মিটিয়েছি। আপনাকে বলছি না।

বেয়ার: শৈশব থেকেই এমন চটকদার পোশাক পরতেন?

মোদি: স্কুলে যেতাম ফিটফাট। তামার ঘটিতে কয়লা ভরে ইস্ত্রি করতাম। বাবাকে সাহায্য করতাম। স্টেশনে চা বিক্রি করতাম। হিমালয়ে কাটিয়েছি অনেক বছর। আজও সেটাই শক্তি দেয়।

মেঘ ডাকছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। জঙ্গল পেরিয়ে দুজনে পানির কাছে গেলেন। বেয়ার তুললেন মায়ের প্রসঙ্গ। মোদী জানান, মায়ের ৯৭ বছর বয়স। এখনও নিজের সব কাজ নিজেই করেন। বেয়ার যোগ করেন, মা তো মা-ই হয়। আমার ছবি দেখে বলে, আগে চুলটা কেন আঁচড়ে নিসনি।

এর পরে ক্যামেরায় মুখ বাড়িয়ে বেয়ারের স্বগতোক্তি, যত বারই ওকে নিজের কথা বলতে বলছি, তত বারই ভারতের কথা বলছেন। পশ্চিমে আমরা সবাই নিজের কথাই ভাবি।

অনুষ্ঠানের নাম ম্যান ভার্সাস ওয়াইল্ড বা মানুষ বনাম বন। মোদির কিন্তু উল্টো সুর। বলতে থাকেন, যখনই প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষের কথা বলি, সেখান থেকেই ভুলের শুরু। আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। তবু প্রথম বৃষ্টি হলে, প্রচুর পোস্টকার্ড কিনে বাবা আত্মীয়স্বজনকে চিঠি লিখতেন— আজ আমাদের এখানে বৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে এমনই সম্পর্ক আমাদের। গাছ কাটতে দেয়া হত না। কারণ গাছের প্রাণ আছে।

ভেলায় মোদি বসে। র‌্যাফট ঠেলে এগোলেন বেয়ার। তিনি বললেন, দুই নদীর সংযোগস্থলের জায়গাটাকে ভয় পাচ্ছি। নির্বিকার মোদি বললেন, শৈশব এভাবেই কেটেছে। ভয় পাই না।

বেয়ার প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রসঙ্গ তুলতেই মোদীর জবাব, এটা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। ভারতে প্রতিটি গাছকে ভগবান মানা হয়। প্রকৃতিকে ভালোবেসে চলতে হবে।

অনুষ্ঠানটির প্রচার শেষ হওয়ার পর ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টুইট করে প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যাপক প্রশংসা করেন।

তিনি বলেন, সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণের সঙ্গে সহাবস্থান, তাদের সুরক্ষা এবং প্রকৃতির সংরক্ষণে ভারতীয় ঐতিহ্যের কথা বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী। গর্বের মুহুর্ত।

তবে মোদীর এ কাণ্ডে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মোটেও খুশি নন। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে পদ্মশ্রী পুরস্কার জয়ী প্রশান্তকুমার সেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠান নিছকই পর্যটনের প্রচার। এর সঙ্গে বন, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।

বাঘ বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী বলেন, হেলিকপ্টারে উড়ে দলবল নিয়ে জিম করবেট উদ্যানে গিয়ে মোদী উল্টো বনের নির্বিঘ্নতাই ক্ষুণ্ণ করলেন।