তারল্য সংকটে ব্যাংক: এক সপ্তাহে ধার সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা

    95

    ঢাকা সংবাদদাতা: হঠাৎ করেই ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট তীব্র হয়েছে। গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ধার করেছে ব্যাংকগুলো। ছোট-বড় সব অঙ্কের টাকা তোলার চাপ বাড়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাংক খাতে ৫ দিন লেনদেন বন্ধ থাকবে। এ কারণে গ্রাহকেরা এখনই প্রয়োজনীয় টাকা তুলে রাখছেন। এর ফলে নগদ টাকার চাহিদা বাড়ছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, ব্যাংক খাত থেকে অতি সম্প্রতি সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণেও ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ টাকার টান পড়ছে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটি, ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর শুক্র ও শনিবার; ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সাধারণ ছুটি; ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক হলিডে। এ কারণে এদিনও ব্যাংকে কোনও ধরনের লেনদেন হবে না। অর্থাৎ এই বছরের শেষ সাত দিনের মধ্যে পাঁচ দিন ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ থাকবে।

    প্রসঙ্গত, নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে গেলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে যে টাকা ধার নেয়, তাকে রেপো বলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান রোপো রেট ছয়।

    জানা গেছে, গত সপ্তাহে ২১টি ব্যাংক নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ধার নিয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর ৫৪৬ কোটি ও ১৯ ডিসেম্বর নিয়েছে ৭৬৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০ ডিসেম্বর নিয়েছে সবচেয়ে বেশি ৯২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

    এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, এখন ডিসেম্বর ক্লোজিং চলছে ব্যাংক খাতে। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে একাদশ জাতীয় নির্বাচন। আছে ছুটিও। সব মিলিয়ে নগদ টাকার চাহিদা বেড়েছে।

    সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ধার নিয়েছে এবি ব্যাংক। এই ব্যাংকটি ধার নিয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংক ১৮৩ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংক ৫০ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এনআরবি ব্যাংক ৪১ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক ২৭ কোটি টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক নিয়েছে ২৫ কোটি টাকা।

    এদিকে, নগদ টাকার সংকট কাটাতে আন্তঃব্যাংক রেপোতে সবচেয়ে বেশি টাকা ধার নেওয়া হয়েছে গত ১৮ ডিসেম্বর। ওই দিনটিতে দুই হাজার ৩২২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ধার নিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক। ওই দিন সর্বোচ্চ সুদের হার ছিল সর্বনিম্ন চার দশমিক ২৫ ও সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

    অন্যদিকে, নগদ টাকার সংকটে কলমানি মার্কেটেও বেড়েছে সুদের হার। গত ১৮ ডিসেম্বর কলমানি মার্কেটে সর্বনিম্ন এক দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে টাকা ধার পাওয়া যেতো। পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর থেকেই সর্বনিম্ন সুদের হার উঠেছে দুই দশমিক ৮০ শতাংশে। এক শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এক দিনের ব্যবধানেই। এভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে সুদের হার। গত ২০ ডিসেম্বরে কলমানি মার্কেটে ছয় হাজার ১৮৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

    এদিকে, প্রয়োজনীয় আমানত না আসায় গত দুই বছরে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ৭৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ ধার করে গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (২৪ মাসে) ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ২ লাখ ৪২ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। অথচ এই সময়ে ব্যাংকগুলোতে আমানত এসেছে মাত্র ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। ফলে এই দুই বছরে ব্যাংকগুলোকে ৭৭ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা ধার করতে হয়েছে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় বছরজুড়েই ৩০টিরও বেশি ব্যাংক এখন ধার করে (ঋণ করে) চলছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআরআর (নগদ জমা) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ সঞ্চিতির হার) জমা রাখতে পারছে না। বেশ কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকাও বেশি।