দারিদ্রতা ও শিক্ষার উপর বাংলাদেশী বংশদ্ভোত ব্রিটিশ রাজনীতিক আফজাল সৈয়দ মুন্না গবেষণা

153

মতিয়ার চৌধুরীঃ এশিয়া আফ্রিকা সহ তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্রতা ও শিক্ষার উপর গবেষণা চালিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বৃটেনের মেইনষ্টীম রাজনীতিক বাংলাদেশী বংশদ্ভোত শিক্ষক আফজাল সৈয়দ মুন্না। গবেষণা ও কমিউনিটি সেবায় বিশেষ অবদানের জন্যে সম্প্রতি তাঁকে এওয়ার্ড প্রদান করেছে লন্ডনের আফ্রিকান ডায়াসপারা কমিউনিটি, আর এ উপলক্ষে হাউজ অব কমন্সে আয়োজন করা হয় এক অনাড়ম্বর অনুষ্টানের।
যে মানুষটি অত্যন্ত নীরবে নিভৃত্বে কাজ করে যাচ্ছেন সেই সাথে বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্বল করছেন তার সম্পর্কে জানতে আমরা তার মুখোমুখী হয়েছিলাম। কে এই আফজাল সৈয়দ মুন্না আর কেনইবা বিদেশীদের মাঝে তাঁকে নিয়ে এতো আগ্রহ। শুধু গবেষণাই নয় আগামী ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লিবারেল ডেমক্রেট পার্টি থেকে বাকিং এন্ড ডাগেনহ্যাম আসনে একজন সম্ভ্যাব্য প্রার্থীও আফজাল সৈয়দ মুন্না। তার প্রচেষ্টায় নিউহ্যাম বার্কিং ও ডাগেনহ্যাম বারায় লিবারেল ডেমক্রেট পার্টি আগের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন বেশ শক্তিশালী। আফজাল সৈয়দ মুন্নার কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিল শিক্ষা এবং দারিদ্রতা নিয়ে গবেষণার বিষয়েঃ- উত্তরে আফজাল সৈয়দ মুন্না বলেন শিক্ষা এবং দারিদ্রতা নিয়ে আমার গবেষণার শুরু ১৯৯৮ এর দিকে যখন আমি স্নাতক শিক্ষার্থী, আমার মূল গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল কিভাবে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে দারিদ্রতার যাতাকল থেকে দরিদ্র জনগোষ্টীকে মুক্ত করা সম্ভব। এই বিষয়ে আমার প্রথম গবেষনা পত্র প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে, যার বিষয়বস্তু ছিল দারিদ্র বিমোচন এবং সহায়ক যুক্তি।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল তার বৃটেনের মূলধারার রাজনীতিতে আসার বিষয়েঃ- উত্তরে আফজাল সৈয়দ মুন্না জানান বর্তমান রাজনীতির অদূরদর্শি পরিকল্পনা, মেধাশুন্য রাজনীতি আর বেপরোয়া শিক্ষা খাতে বাজেট ঘাটতির বিষয়টা আমাকে অসম্ভব ভাবে ভাবিয়ে তোলে, আমি অনুভব করি আমাদের কমিউনিটিতে রাজনীতির বিচরণ এবং সুস্থ রাজনীতির চর্চা অপ্রতুল। শিক্ষক হিসেবে রাজনীতি শিক্ষা আমার প্রতিদিনকার শিক্ষকতার বিষয়বস্তু। আর তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কেননা প্রতিদিনকার এই জীবন জীবকার বিষয়টাকে একটা পরিপূর্ণ রুপ দেই রাজনীতিতে সরাসরি অংশ গ্রহনের মাধ্যমে।
আফজাল সৈয়দ মুন্নার জন্ম বাংলাদেশের বরিশাল শহরে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে। তার পিতা মীর আব্দুল কাদের ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১ সালে সরকারী চাকুরীতে থাকা কালীন সময় দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযু্েদ্ধ অংশ নেন। আফজাল সৈয়দ মুন্না একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করেন। মেধাবী এই তরুন ২০০৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্যে বৃটেনে আগমন করেন। ব্যক্তি জীবনে যেমন সফল তেমনি বিদেশের মাটিতে কর্ম এবং মেধা দিয়ে দেশের মুখ উজ্বল করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।
মরহুম সৈয়দ মীর আব্দুল কাদের এবং সুলতানা রাজিয়ার তিন পুত্র এবং এক কন্যার মধ্যে আফজাল সর্বকনিষ্ট। আফজালের শিক্ষার খাতেখরি মায়ের কাছে আর তার শিক্ষার প্রতি একান্ত ভালবাসা আর অনুরাগের কারণেই মাত্র তিন বছর বয়সে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পাশাপাশি একই বছর বড় ভাইয়ের হাত ধরে নাট্যমঞ্চে পা রাখেন একজন শিশু শিল্পি হিসেবে । বরিশাল ‘‘শব্দাবলী’’ গ্রুপ থিয়েটারে একজন শিশু শিল্পি হিসেবে তার সুচনা হয় গণমাধ্যমে। একে একে তার চেতনার বিকাশ ঘটে নাটক, কবিতা, বক্তৃতা এবং একজন কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট হিসেবেও। মাত্র চার বছর বয়সে তার লেখা চার লাইনের ছোট্র ছড়া ছাপা হয় বরিশালের একটি স্থানীয় দৈনিকে। বরিশাল উদয়ন স্কুল থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসী, বিএম কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে এইচএসসী সম্পন্ন করে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। ১৯৯৮ সালে তার যাত্রা শুরু হয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মজীবনে তার বড় ভাইয়ের মিডিয়া প্রডাকশন হাউজ ফেইড-ইন টেলিকমে। অধ্যয়নের পাশাপাশি চালিয়ে যান নাট্য এবং সাহিত্য চর্চা। মাইকেল মধুসুধন দত্তের একান্ত এই ভক্ত সনেট আকারে লিখে যান ত্রিশটিরও বেশী ইংরেজী কবিতা, একই সনে বন্ধু গোলাম সারওয়ার অপুর সাথে যৌথভাবে প্রথম বারের মতো প্রকাশ করেন কবিতার বই ‘‘তোমার তৃষœায়’’। ১৯৯৮ সালেই শুরু করেন সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়াররিং এর উপর পড়াশুনা কিন্তু এক বছর পেরুতেই সাহিত্য পিয়াসু এই মানুষটি সিদ্ধান্ত নেন এই বিষয়টি তঁকে আর আকর্ষন করছেনা, আর তাই শুরু করেন ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে অধ্যয়ন। ২০০২-২০০৬ সালে ইসলামিক ইউনিভারসিটি থেকে ব্যবসা প্রশাসনের উপর স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর কমপ্লিট করেন। অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি মার্ক-সি-ল্যান্ড নামক একটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পেনীতে (২০০৪-২০০৮) টিম লিডার হিসেবে কাজ করেন। এর ফাঁকে কোম্পানীর অর্থায়নে ঢাকাস্থ ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে চ্যাটার্ড ইন্সটিটিউট অব শিপ ব্রোকারের উপরে ফেলোশীপ অর্জন করেন। ২০১০ সালে ইউনিভারসিটি অফ ওয়েলস, কার্ডিফ থেকে ব্যবসা প্রশাসনের উপর পূরনায় মাষ্টার্স করেন। একই সনে লন্ডন সেন্টার ফর মার্কেটিং থেকে অর্জন করেন প্রশাসনিক ম্যানেজমেন্ট এর উপরে চ্যাটার্ড ডিপ্লোমা। একই বছর এসেক্স ইন্টারন্যাশনাল কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
২০১৩ সালে কোয়ালিফাইড টিচার ষ্টেটাস অর্জনের মাধ্যমে শুরু হয় তার দক্ষ শিক্ষক জীবনের নতুন অধ্যায়। ঠিক তার পরের বছর ইউনিভারসিটি অফ অক্সফোর্ড থেকে অর্জন করেন রিসার্চ ফেলোশিপ। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একাধিক কলেজে শিক্ষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন ক্ষদ্র উদ্যোক্তা এবং একজন শিক্ষা পরামর্শক হিসেবে বিভিন্ন ক্ষুদ্র এবং মধ্যম স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্টানে পরাশর্মক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি ২০১৬ সাল থেকে ইউনিভারসিটি অফ বাথ থেকে শিক্ষার উপর পিএইচডি করছেন। ২০১৮ সালে হাইয়ার এডুকেশন একাডেমী, ইংল্যান্ড থেকে হাইয়ার এডুকেশনের উপরে ফেলোশীপ অর্জন করেন। ২০০৮ সালে থেকে বৃটেনের মেইনষ্ট্রীম রাজনীতিতে অংশ গ্রহন করেন, কিন্তু ২০১৫ সালে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৭ সালে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ইলেকশনে প্রার্থী নির্বাচনের পাশাপাশি ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারনা চালিয়ে যান। আফজাল সৈয়দ মুন্না ২০১২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ফারজানা ইসলাম মৌরীর সাথে যিনি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে লন্ডনের একটি স্কুলে টিচার এ্যসিসটেন্ট হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বিবাহিত জীবনে আফজাল সৈয়দ মুন্না এক পুত্র সন্তানের জনক তার নাম আবান ফাইজান সৈয়দ।