করোনাকালের গল্প : একজন খানের করুন পরিনতি

327

আহমদ হোসেন হেলাল: আজ রোববার ছুঠির দিন। ব্যাংকের বড় একজন অফিসার । তিনি সুদর্শন জাকের হোসেন খান । সবাই খান সাহেব নামে ডাকে । তিনি ফজরের নামাজ পড়েছেন। সময় মত নামাজ আদায় হলো । তাই তার ভালই লাগছে । মুখে বেশ হাসি হাসি ভাব। কারন মেয়ে খাদিজা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল ফলাফল নিয়ে পাশ করেছে। খাদিজা ও জামিল তাদের দুই সন্তান। জামিল এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতি হবে । ছেলেমেয়ের সাফল্যে পিতামাতা বেশী খুশি হন। নিলুফা এখনো ঘুমিয়ে আছেন। প্রতি রাতে অনেকগুলো ভারতীয় ড্রামা সিরিয়াল দেখে ঘুমাতে যান। দেরী করে ঘুম থেকে উঠেন।

আজ খান সাহেব সপিং এ যাবেন। দুপুর সাড়ে বারোটা । কাপড় পরে রেডি হয়ে বসে আছেন । নিলুফাকে ঘুম থেকে ডাকতে গিয়েছিলেন। নিলুফা জোরে চিৎকার করে ধমক দিয়েছে । খান বলেছেন তুমি রাগ করছো কেন ? মেয়েটার জন্য কিছু উপহার কিনবো ও তোমাকে নিয়ে সপিং এ যাবো। একা যেতে মন চায় না।

নিলুফা চিৎকার দিয়ে বলে তুমি আমার সামনে থেকে চলে যাও। খান হাসি দিয়ে বলেন , ঠিক আছে শান্ত হও।
নিলুফার চিৎকার চেচামেচী শুনে অন্য রোম থেকে খাদিজা ও জামিল এসেছে । তারা বললো মা কি হয়েছে । তোদের বাপকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যা। না হয় আমি এখন এই বাড়ী থেকে চলে যাবো । খান সাহেব ছেলেমেয়েদের সামনে বেশ লজ্জা পেলেন। ছেলেমেয়েরা বললো আববা নিচে ড্রইং রোমে চলে যান। তারপর ছেলেমেয়েদের বলে খান সাহেব শহরের উদ্দেশ্যে মন মরা হয়ে বাহিরে চলে যান।

নিলুফা হলো খান সাহেবের স্ত্রী ।পুরো নাম নিলফা ইয়াছমিন। নিলুফা খুব সুন্দরীও নন। তবুও খান বিয়ের পর থেকে এখন নিলুফাকে খুব ভালবাসেন । পৃথিবীর সব সৌন্দর্য দিয়ে নিলুফাকে দেখেন। স্ত্রী তো পুরো জীবনের বন্ধু ও জীবন সংঙ্গিনী।

বৃটেনের চমৎকার রৌদ্র উজ্জ্বল আবহাওয়া । বাতাসের সাথে ঠান্ডা আমেজ । সামনে দিয়ে প্রেমীক প্রেমীকা সহ অনেক মানুষ এলোমেলোভাবে ঘুরাঘুরি করছে । খান সাহেব কফি সপের সামনে চেয়ারে বসে আছেন । কফিসপের ক্যাপাচিনো এনে কফিতে চুমুক, বেশ আননদ লাগছিল। ভাবেন আসলে বহু বছর আগে কফির জনম আরব দেশ থেকে । বৃটেনের বিশ্ব বিখ্যাত কফি ব্রানড কোসটা কফি । কিনতু বাংলাদেশের সৃতিময় সাধীনতার মত ১৯৭১ সালে কোসটা কফির জনম হয়েছিল।

যাক খান এখন ভাবেন নিলুফা যদি এখন আমার সামনে বসতো ভাল লাগতো । নিলুফাকে খান প্রায় সময় বলেন, চলো আমরা রেস্টুরেন্ট এ খেতে যাই । কফি সপে যাই। আবার বলেন, নিলুফা চলো কোথায় বেড়াতে যাই নিলুফী বিরক্ত হন।

নিলুফা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়াতে যায়। রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। তারা কেউই প্রায়ই খানকে বলে যায় না। এমনকি খান সাহেবর ছুঠির দিন ছেলেমেয়ে নিলুফা বিরক্ত হয়। ছেলেমেয়ে যখন বাহিরে যায় মা নিলুফাকে বলে বিদায় নেয়। তাদের বাবা খান কে বলে যায় না । তবুও খান নিরবে হাসি দিয়ে হাত তুলে ছেলেমেয়েদের বিদায় জানান। ছেলেমেয়েরা মাকে সনতুষটি বা গুরত্বপূর্ণ করতে বাবাকে গুরত্বহীন করে।

খান বুঝতে পারেন না নিলুফা কেন এমন হলো । বিবাহের পর ভাল ছিলো । ছেলেমেয়ে হওয়ার পর নিলুফা বেপরোয়া ভাব চলে আসে। নিলুফা কয়েকবার বিবাহ বিচ্ছেদের কথা বলেছে। ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে খান বিচ্ছেদের কথা ভাবতে পারেন না। স্ত্রীকে খুব ভালবাসেন। খান মনে করেন নারীগন ঘরের সৌন্দর্য । নিলুফাকে ছাড়া বাচতে পারবেন না ।
খানের বন্ধু নুরুল আমিন একজন উকিল । তিনি বলেন,মেয়েদের পক্ষ থেকে বেশী তালাকের চিনতা আসে।। কিনতু প্রায় মেয়েরা বড়বড় সন্তান নিয়ে আলাদা হয়ে যান। ছেলেমেয়েদের মানষিক বিষয়টি কেউই চিনতা করেন না। আর খান সাহেবর কথা হলো মায়েরজাতী মেয়েদের সম্মান করতে হবে । ইসলামে দুইটি বৈধ কাজকে সম্মানের চোখে দেখা হয়না। তা হলো ভিক্ষা বৃত্তি ও তালাক ।

কিনতু নিলুফা সব সময় আতীয়সজনের সামনে খান সাহেবকে অপমান করেন । খান সাহেব হাসি দিয়ে অপমানের কষ্ট কাটার চেষ্টা করেন । খান সব সময নিলুফাকে বলেন, ছেলেমেয়ের সামনে ঝগড়া করবেনা। তাদের মনমানসিকতার উপর আঘাত আসে। আর ছেলেমেয়ে ও আত্মীয় স্বজনের সামনে আমাকে অপমান করবেনা । কিনতু নিলুফা ঘুরেফিরে ঝগড়াটে আচরন করে ।

খান স্ত্রী নিলুফার উগ্রস্বভাবের আচরনকে স্বাভাবিক হিসেবেই নিয়েছেন। মাঝেমধ্যে খানের খুব কষ্ট হয়। তখন খান উপরে তাকিয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলেন। আবার নিজে নিজেই হাসেন। মাঝেমধ্যে অন্য জগৎ এ চলে যাওয়া ভাল ।

খান যে ব্যাংকে কাজ করেন সেই ব্যাংকের সবাই খানকে পছন্দ করেন । খানকে আতীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের সবাই পছন্দ করে । কিন্তু নিলুফা তাকে পছন্দ করে না। একদিন খান হাসি মুখে নিলুফাকে বলেছেন আমার চেহারা এত খারাফ না । কিনতু তোমার পছন্দ নয় কেন বুঝতে পারলাম না ।

খান পুরো বুঝে নিয়েছেন, মানুষের জীবন ক্ষনিকের জীবন । দুনিয়ার এ জীবনতো খেলা আর তামাশা মাত্র । এখানে আরামের জায়গা নয়। জীবন হলো পরিক্ষার জায়গা । জীবন পরিক্ষায় ভালভাবে পাশ করলে অনন্ত কালের জন্য সুখে কাটবে ।

ছেলেমেয়ে বা নিলুফা অসুস্থ হলে খান বেশ চিনতা করেন । ছেলে মেয়ে সকালে নাসতা না করলে খানের মন খারাফ হয়ে যায় ।মহান আল্লাহ সামান্য এক ভাগ মায়ামমতা দিয়ে আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন । নিরানববই ভাগ মায়ামমতা আল্লাহ নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন।

আজ ব্যাংক হলিডে। খান নিলুফাকে বলেছেন, নিলুফা চল আমরা রেস্টুরেন্টে খেতে যাব। সাথে ছেলেমেয়েরা যাবে । নিলুফা প্রথমে না বলেছিলো। কিনতু খান বললেন , আজ আমার কেন জানি খুব আনন্দ লাগছে । কেউ না করলে চলবে না। রাতে রেস্টুরেন্টে চমৎকার খাওয়া হলো । খান সাহেব খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে স্ত্রীকে গভীর ভাবে দেখলেন । কেন জানি খানের খুব মায়া হলো ।
রাতে ঘরে এসেই খান ঘুমিয়ে পড়লেন । শরীর বেশ খারাফ লাগছে ।বমিবমি ভাব করছে । নিলুফা টেলিভিশনে ভারতীয় ড্রামা দেখছেন। ছেলেমেয়ে তাদের রোমে চলে গেছে । রাত দেড়টা বাজে। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। নিলুফা বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখেন এ্যাম্বুলেন্স। উপর থেকে নেমে আসলেন খান । বললেন নিলুফা আমি হাসপাতাল চলে যাচ্ছি । আমার জন্য দোয়া কর। আমার খুব ঠান্ডা লাগছে । ধম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
নিলুফার ভারতীয় ড্রামার ঘোর ভাংগার মধ্যেই খান সাহেব হাসপাতাল চলে গেলেন। টানা চার দিন পর হাসপাতালে খান করোনায় মারা গেলেন । বিশেষ কারনে লাশের দাফন অন্যরা করেছেন ।

প্রিয়তমা সত্রী নিলুফা আছে প্রিয় ছেলেমেয়ে আছে কিন্তু খান নেই । ভালবাসার মানুষ খান অনন্ত পারাপারে। যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসেনা।! ! !
“ The goal of life is death “ ! ! ! ! !


লেখক ; আহমদ হোসেন হেলাল ।