আত্মপরিচয়ে নিজ ভাষার গুরুত্ব

92

(পর্ব -২)
মোঃ নজরুল আমিন

একজন নেতা তখনি সেরা নেতা হবেন যখন লোকেরা জানবে যে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে । যখন তার কাজ শেষ হবে এবং লক্ষ্য পূর্ণ হবে, সে বলবে, আমরা এটি করেছি, এতে জনগণের অংশগ্রহন আমার চেয়ে বেশি ছিল। কথাগুলো বলছি এই জন্য যে, আমাদের বাংলা ভাষার গ্রান্ট কাউন্সিল বন্ধ করে দিচ্ছে এতে সকলের সরব উপস্থিতি সু-নেতৃত্বের দরকার। আমাদের অগ্রজেরা অবশ্যই ভালো ইতিহাস স্থাপন করতে পেরেছিলেন বলেই তো আমরা আজ টাওয়ার হ্যামলেটসে প্রায় ৫০% বাঙালী কাউন্সিলর এবং ন্যাশনাল পর্যায়ের চারজন পার্লামেন্টারিয়ান পেয়েছি। তাই শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ের নীতিগত সাহায্য এবং উন্নত মানের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ আছে, বা আমাদের ভয়েস উচ্চ পর্যায়ে পাঠানোও সম্ভব। এখন দরকার শুধু সংঘটিত হওয়া, তাই এখন আমাদের প্রতিনিধিত্বের বিচারে আমরা অনেকটাই সমৃদ্ধ এবং সবাই সঙ্গবদ্ধ —এই প্রতীতি নিয়ে যে আমরা সব অচলায়তন ভেঙে একদিন সবকিছুতে অবদান রাখব। এই একতার প্রতীতি যে কোন দাপটকে বুঝিয়ে দেবে যে আমরাও তাদের অংশ এবং জাতীয় অগ্রগতিতে আমরাও ভূমিকা রাখতে চাই।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা বিশ্বায়নের দাপটে যখন বাংলাভাষা মুমূর্ষু রূপ নেয়, তখন বাঙালির জাত্যাভিমানের প্রশ্ন আসে, স্বাতন্ত্রবোধে আঘাত পায় এবং মানুষ জেগে উঠে । কারণ ভাষার বীজ বপন হওয়ার কারণে আমাদের এথনিক আইডেন্টিটি প্রবল হয়ে উঠেছিল, আমাদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে, কাজের সঙ্গে পরবাসে ভাষার মিশ্রণ ঘটেছিল। আপনি যে কেউই হোন না কেন, আপনার ঐতিহ্য এবং ভাষা আপনার পরিচয়। এটাই আপনাকে অনন্য করে তোলে।
বলতে গেলে এই দেশে সফলভাবে বাংলাভাষাবাসীদের তৃতীয় প্রজন্ম অতিবাহিত হচ্ছে (অবশ্যই বাংলা ভাষা বাসিদের অনেক আগের) , ব্রিটেনের বাঙ্গালীদের অভিবাসন বিচরণ এবং বসবাসের ইতিহাস অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের তুলনায় অনেক প্রাচীন। এই দেশে বাংলা সাহিত্যের চর্চা এবং ভাষার প্রচলন আমাদের পূর্বসুরীদের অনেক কষ্টের অবদান এবং ব্রিটেন তাদের বহু সংস্কৃতিবাদ (Multiculturalism) বা বিভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থান মূলতঃ সবসমই স্বাগত জানায়। কারণ ব্রিটিশরা জানে সামাজিক আচরণ এবং তাদের নিজস্ব নিয়ম প্রত্যেক মানবসমাজের হৃদয়ে প্রোথিত । নৃবিদ্যার কেন্দ্রিয় ধারণা হচ্ছে যে, মানুষের আচরণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ধর্ম, পোশাক ইত্যাদির মত ভাষা ও একটি শক্তিশালী টুল, এবং একে বা ওই প্রথাগুলিকে সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব বলে মনে করা হয়, যা সব মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। আর এ জন্যই বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এবং স্থানীয় প্রশাসন অন্যান্য ভাষা তথা বাংলা, চাইনিজ, ম্যান্ডারিন, এরাবিক, উর্দু ও লিথুনিয়ান ভাষা পড়ানোর জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং অনুদান প্রদান করে থাকে। এটি মূলত Multiculture এর বিকাশ এবং বিশ্বায়নে বহুসংস্কৃতির এক বিজয় গান । এ বিজয় গানে ধরে নেওয়া হয় যে, বিশ্ব কোনও বিক্রয় কেন্দ্র নয়, এটি ‘কৌতূহলপূর্ণ’ বৈশিষ্ট্য নয়, এটি কোনও ছদ্মবেশী বিপণন চালানোর স্থান নয়, এটি কোনও শৈল্পিক বিবৃতি নয়, এটি কোনও প্লট ডিভাইসও নয়, এটি বীজহীন আঙ্গুরের মতো এবং এটি একটি বহুসংষ্কৃতিক প্রতিষ্টান, এবং এটাই ব্রিটিশরা বিশ্বাস করে এবং তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় ।
আমরা যদি আলোচনায় আসি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, তবে আমরা দেখতে পাবো যে, উনেস্কোর মহাপরিচালক এরিনা বলেন , ” সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সমাজ ও তাদের সদস্যদের শান্তি পূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার একটা গুরুত্ব উপাদান”। তাইতো আমাদের মনে করা উচিত, ভাষা আমাদের শিকড়ের পরিচয়, এবং উত্তরাধিকার-সংরক্ষন এবং বিকাশের শক্তিশালী হাতিয়ার। এরই সূত্র ধরে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘ (ইউনেস্কো) একুশে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই বাংলা ভাষাদিবস হয়ে গেলো আন্তর্জাতিক ভাষাদিবস – সারা পৃথিবীর এক উৎযাপনের দিবস। আবার আসি আন্তর্জাতিক আলোচনায়, প্রত্যেক দেশ তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে কতটা লালন করে এই প্রশ্নে, এ প্রসঙ্গে চীনের কথা উল্লেখ করা যায়, তারা ইংরেজির পাশাপাশি তাদের নতুন প্রজন্মকে চীনা ভাষ, সাহিত্য, সংস্কৃতি শিখতে উৎসাহিত করে। আমেরিকা এবং ব্রিটেনসহ সারা পৃথিবীর বড় রাষ্ট্রগুলোতে অভিবাসী চীনা এবং তাদের নতুন প্রজন্মকে চীন সংস্কৃতি শেখায়। ইস্রাঈল সরকার গ্রীষ্মের সময় তাদের ছাত্র ছাত্রীদেরকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিজ দেশে বেড়াতে নিয়ে যায়। জার্মান ও তাদের ভাষাবিজয় বজায় রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্টান এবং তাদের বিখ্যাত রেডিও ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন Deutsche International public broadcaster নিবেদিত ভাবে কাজ করে যাচ্ছে জার্মান ভাষার বিজয় অবিচল রাখতে ।
মানুষ কীভাবে তার সংস্কৃতি হারায় এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করা যে পারে। এটা অত্যন্ত কষ্টের বিষয় হবে যখন, আমাদের সব সংস্কৃতি এক সময় হারিয়ে যাবে, তখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরা হয়তো কোনো ধর্ম পালন করবে না, আবার অন্যজন হয়তো মুসলিম ধর্ম পালন করবে। বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের বিবাহ এবং মিশ্র সম্পর্কের উৎপত্তি ঘটবে, তাই মৃত্যুর আগে যদি কোন ব্যাক্তি অছিয়ত করে না যান তাকে কীভাবে সৎকার করা হবে, তাহলে তার সৎকার হয়তো নিজ ধর্ম রীতি অনুযায়ী হবে না। এটা কেন ঘটলো ? তার সংস্কৃতিকে শুধুমাত্র হারানোর জন্যই এটা ঘটলো। আমি শুধুমাত্র বলছি যে, সবার সাথে সবার মিলন ঘটুক যেটা রাষ্ট্রও চায় এবং সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসে, শুধুমাত্র তোমার স্বকীয়তাটা বজায় রেখে এগিয়ে গেলে সমাজ এবং দেশ বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভরে উঠবে এবং Multiculturism এর বিজয় হবে, আমরা সুখী হব। সমস্যা হলো আমরা যেন বেশি বেশি সোয়াল জবাবে জড়িয়ে না পরি, এতে অবাঙালিরা মুচকি হেসে আমাদের এড়িয়ে যাবেন, ফলে বাংলা ভাষা নিয়ে গর্বের জায়গাটা হারিয়ে ফেলবো আমরা। আমাদের জাতির রুপোর দর্পন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, আমরা এগোতে পারবো না। ।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা বড়ই প্রযোজ্য মনে করছি, গল্পটা অনেকেই হয়তো জানেন।
” একবার একটা ঈগলছানা কিভাবে যেন দলছাড়া হয়ে মুরগির খোঁয়াড়ে পড়ে গেল। সেখানে একটি মুরগির বড় দয়া হলো বেচারার দুরবস্থা দেখে, আপন সন্তানের মত দরদ দিয়ে লালন-পালন করে বড় করে তুললো সেটিকে। ঈগলটি এখন একটু বড় হয়েছে, গায়ে গতরে তার চারপাশের মুরগিদের চেয়ে ঢের বড় সে। কিন্তু, চলাফেরায় স্বভাবে একদম মুরগিদের মতোই। তাদের সাথেই থাকে, তাদের সাথেই ঘুমায়, তাদের মতোই ভীতু সে। একদিন তার ভাইদের সাথে যাচ্ছিলো সে, হঠাৎ আকাশে কি যেন একটা উড়ে গেল। তাকিয়ে দেখে কী বিশাল একটা পাখি, কী তার দৃপ্ত পাখার ঝাপটানি, কি সম্রাটের হালে সে উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে- দেখে ঈগলটির একদম চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! মা মুরগির কাছে গিয়ে বললো, “এটা কি পাখি মা? আমরা কি এভাবে উড়তে পারি না?”
মুরগি বললো “কী বোকার মত কথা বলছো! আমরা কিভাবে উড়বো? ওটা তো ঈগল পাখি, ওভাবে উড়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব!” ছোট্ট ঈগলটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পালের সাথে হাঁটতে লাগলো। বেচারা কোনদিন বুঝলোও না তারও রাজার মতো আকাশে উড়বার কথা ছিল “ (সংগৃহিত, ও কিছুটা রূপান্তরিত )। কোন কিছু দাবি করাটা কিন্তু কোন অন্যায় নয়, যারা দাবি করে তাদেরকে উন্নত জাতি হিসেবেই সবার বিবেচনায় স্থান পায়, এবং অধিকারগুলি আইনের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে গণ্য করা হয়।
শুধু একজন ম্যান্ডেলার উপস্থিতি পুরো একটা জাতিকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে সেই দৃশ্য দুবার দেখার সুযোগ হয়েছে বিশ্ববাসীরও, আবার অং সুন্ স্চীর শান্তির নভেল পুরস্কার অর্জনের পরবর্তী অত্যাচারও আমরা দেখেছি । ইতিহাসে সব কিছুরই সাক্ষী থাকে , যেমন শিরোস্ত্রাণের সাক্ষী থাকে , তেমনি ভালোবাসার লাল গোলাপেরও। আমরা সবাইকে কঠুরভাবে বিচার করবো না, যদি তুমি মানুষকে বিচার করতে যাও তাহলে ভালবাসার সময় পাবে না, এবং কিছু কমিউনিটি শুভাকাংখীকে আমরা হারিয়ে ফেলবো। ভালবাসা মানে কাউকে জয় করা নয় বরং নিজেই কারো জন্য হেরে যাওয়া। আমরা একত্রিত হব, একে ওপরের কাছে হেরে যাব এবং আমরা বলব, Multicultre-এর বৈচিত্রতা বাঁচাতে কাউন্সিলের করণীয় আছে। একটি বহুসংস্কৃতিক সমাজ অন্যের সংস্কৃতিকে ও ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে না বরং শুনতে, দেখতে, এবং সংলাপ করতে প্রস্তুত থাকে এবং চূড়ান্ত বিশ্লেষণে করে সিদ্ধান্তে পৌঁছে।