ভ্রমণ কাহিনী -০২: মন্ট্রিয়েল টু নায়াগ্রা, কানাডা।

668

সময়কাল ২ মার্চ, ২০১৭
সকাল ৯:০০- রাত ১২টা

গতকাল (১ মার্চ) রাতে হোটেলে ফিরে মোটামুটি নিশ্চিত হলাম যে, সবকিছু মিলিয়ে এ যাত্রায় পূর্ব নির্ধারিত অনেক কিছু নাও হতে পারে। মন্ট্রিয়েল এ সীমিত সময়ের ঘুরাঘুরি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার বাড়াবাড়িতে অন্য কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে হলো। আর এমনিতেও হোটেল বুকিং ছিলো ১ মার্চ পর্যন্ত। রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম নায়াগ্রা জলধারা দেখতে যাবো। সাথে সাথে এই সিদ্ধান্তও হলো যে ড্রাইভ করবো। নেহায়েত কোনো অজুহাত না থাকলে কানাডা তে এসে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্ধর্য অবলোকন না করাটা প্রকৃতির প্রতি এক বিবেকহীন অবিচার এবং নিজের কান্তিবোধ নিয়ে সীমাহীন প্রশ্ন থাকবে বলেই মনে হলো, যদিও আমার বর্তমান অবস্থান থেকে নায়াগ্রা জলধারার দূরত্ব ৬৫২ কিলোমিটার, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ছয় ঘন্টা।

রাতেই রেন্ট এ কার এর সাথে কথা বলে ঠিক করে রাখলাম আগামীকাল (২ মার্চ) সকাল ১০টার পরে গাড়ি কালেক্ট করবো বলে এবং নায়াগ্রার কাছাকাছি একটা B&B বুকিং দেওয়া হলো।

২ মার্চ, সকাল ৯টা। বাইরে তাপমাত্রা হিমাংকের ও নিচে (-৮)।

হোটেল রুমে হটাৎ একটা খসখস আওয়াজ শুনতে পেলাম। দরজার সামনে গিয়ে দেখি একটা A4 সাইজ পেপার। বুজতে মোটেও কষ্ট হলোনা যে এটা আমার গত দু’রাতের আতিথেয়তা গ্রহণের ফিরিস্তি এবং আতিথেয়তা উপভোগ নিমিত্তে আমাকে কি পরিমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তার সুন্দরভাবে উপস্থাপিত একটা চালান নামক পত্র।
চালানটা হাতে নিয়ে দেখা মাত্র আমি কিছুক্ষনের জন্য স্তব্দ। হচ্ছেটা কি এখানে! রুম চার্জ এর সাথে আরো অনেক গুলো চার্জ সংযোজন করা হয়েছে যা সবই সংক্ষেপিত ফর্ম এ লেখা,যার মর্মার্থ বুজার কোনোই উপায় নাই।

চেক আউট এর সময় হলো দুপুর ১২টা। তাই তাড়াতাড়ি গুছগাছ হয়ে সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ হোটেল রিসেপশন এ চলে আসলাম। অপেক্ষায় ছিলাম কারো সাথে কথা বলার জন্য। দেখতে চায়নিজ মতো দারুন ফিটফাট একজন মহিলা আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসলেন।

আমি আমাকে দেয় চালান পত্রটা তাকে দিয়ে কিছু বিষয় বুজতে চাইলাম। দারুন এক স্মিত হাসি দিয়ে আমার কাছ থেকে পত্রটি হাতে নিলো (ভাব খানা এরকম যেনো কতদিন যাবৎ অপেক্ষা করছিলেন এরকম একটি আবদার পূরণের জন্য) এবং চমৎকার ভাবে সব কিছু পাই পাই করে বুজিয়ে দিলেন।

যার সারমর্ম এরকম যে মন্ট্রিয়েল এ তিন ধরণের ট্যাক্স প্রযোজ্য। একটি হলো মিউনিসিপ্যালিটি ট্যাক্স, প্রভিন্সিয়াল ট্যাক্স এবং ফেডারেল ট্যাক্স এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বুজায়ে দিলো যে আমার মতো নাদানকেও প্রতি রাতের জন্য এই ট্যাক্স গুলো দিতে হবে। আমিও দারুণভাবে ভাব বিনিময় করছিলাম যেনো আমি কতই না সৌভাগ্যবান এই পীড়াগুলোর আওতায় পড়ে।

আমি দ্রুত যাবতীয় আনুষঙ্গিকতা শেষ করতে চাচ্ছিলাম। মনের মধ্যে একটা ভয় ঢুকে গেছে এই ভেবে যে এখন বুজি আবার বলে বসবে আরো ৫% দিতে এতো কিছু জানানোর জন্য। এতক্ষণ যেভাবে বিরামহীন নির্মল হাসি দিয়ে সবকিছু বলছিলো তাতে এই সম্ভবনা আমার মাঝে প্রকট হয়ে দাঁড়ালো। ফিটফাট চায়নিজ এর প্রতি মুহূর্তের নির্মল হাসি আমার প্রতি মুহূর্তের নিদারুন কষ্টের কারণ হয়ে গেছে।

কথা শুনতে শুনতে বার মনে হচ্ছিলো এতো কিছুর পরেও এই দেশগুলোকে জনকল্যানমূলক রাষ্ট্র বলা হয়। কতরকম কর ধার্য করে রাখছে। অথচ আমাদের দেশগুলোতে প্রতিবছর নিয়মমাফিক কালো টাকা সাদা করার আনুষ্ঠানিক সময় দেয়া হয়। কখনো কখনো নির্ধারিত সময়কে প্রলম্বিতও করা হয়। ধার্যকৃত ট্যাক্স একটু এদিক সেদিক করে সব ঠিকঠাক করা যায়। এরপরেও আমরা জনকল্যানমূলক রাষ্ট্রের তকমা পাইনা, এটা অন্যায়, ভারী অন্যায়। দেশ সম্পর্কে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে।

যাইহোক, সবকিছু সেরে এবার প্রেসিডেন্ট কেনেডি স্ট্রীট এ যাচ্চি গাড়ি কালেক্ট করার জন্য। হোটেল থেকে বের হওয়া মাত্র ট্যাক্সি পেয়েগেলাম। এ যাত্রায় আর হিটার নিয়ে সমস্যা হলোনা। রেন্ট এ কার অফিসে গিয়ে গতকালের বুকিং এর ব্যাপারে কথা বললাম। দেখি সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছে।

এবার চুক্তি পত্র স্বাক্ষর করতে হবে।

মৌলিক বিষয়ের মধ্যে একটি হলো ৬ দিনের ভাড়া এবং আগাম সম্ভাব্য ক্ষতিজনিত সমপরিমাণ অর্থজমা।

এবার শুরু হলো বীমা সংক্রান্ত লেকচার। এই ৬ দিনের যেকোনো এক্সিডেন্ট এর জন্য একটি বীমা। বিবরণ দিয়ে বুজানো হলো যে, আমি যদি কোনো কারণে গাড়ির কোনো দরজাও কোথাও ফেলে আসি তাহলেও কোনো সমস্যা নাই। আমি তো কোনোরকম কথা ছাড়াই বললাম হ হ এইটা চাই।

স্বাক্ষর হয়ে গেলো।

বিবরণ, দ্বিতীয় বীমা, যদি পথে চলার সময় তোমার গাড়ির চাকার কোনো সমস্যা হয় তাহলে এই বীমা।
এইটা কি বলে! প্রথম বীমায় গাড়ির দরজা ফেলে আসলেও সমস্যা নাই আর এখন কিনা চাকার জন্য আরেক বীমা? চাকা কি গাড়ির অংশ না? বুজলাম কথা বলে লাভ নাই, হয় নেও নয় চুপ থাকো।

জিজ্ঞেস করলাম গাড়িতে ন্যাভিগেশন আছে কিনা? উত্তর, ন্যাভিগেশন এর জন্য প্রতিদিন ৮.৩৬ কানাডিয়ান ডলার দিতে হবে।

কি বলে! এটা তো এমনিতেই গাড়িতে থাকার কথা। কিচ্ছু করার নাই, নিতে হলো। ন্যাভিগেশন স্ক্রিন সেট নিয়ে আসলো, দেখি সাথে তার নাই, আমি তো ভয়ে অস্থির- তারের জন্য কি আলাদা পে করতে হবে নাকি? বিরাট উপকারের ভঙ্গিতে বললো না এটা বিনামূল্যে। এই প্রথম বিনা মূল্য জাতীয় কথা শুনে বেশ ভালো লাগলো। আরো কয়েক ধরণের বীমার বিবরণ দিতে চাইলো। কথা না বাড়ায়ে চুক্তি সম্পন্ন করলাম, আর মনে মনে বলতে লাগলাম মিয়া, কয়দিন অপেক্ষা করো, গাড়ির একটা দরজা ও সাথে করে নিয়ে আসবোনা। বীমা তো করছিই।

এবার যাত্রা শুরুর পালা। গাড়ি নিয়ে মন্ট্রিয়েল এর রাস্তায় বের হওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বুজতে পারলাম যে বিরাট ভুল করে ফেলেছি। না, এটা কোনো মামুলি ভুল নয়, রীতিমতো অন্যায় করে ফেলেছি। রাস্তার বাম দিকে গাড়ি চালিয়ে অভ্যস্ত, এখন নতুন দেশে রাস্তার ডান পাশে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিজেতো বিপদে পড়ছিই রাস্তার সকলকে বিপদে ফেলছি।

মন্ট্রিয়েল শহরের ভিতরে বেশ কয়েকবারই বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি। সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গাড়ি চালানো শুরু করেছি। তার উপর রাস্তার সংস্কারের কাজের কারণে বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ থাকায় এবং ন্যাভিগেশন এ সেগুলোর আপডেট না থাকায় সীমাহীন বিপাকে পড়েগেছি। আশেপাশের পথচারী, অপর পাশ থেকে আশা গাড়ি সবাই হতবাক। আমি নিজে ভয়ে উত্তেজনায় কিংকর্তব্যবিমূড়, মুহূর্তেরই চকিতে দিক পরিবর্তন, থ্রী পয়েন্ট টার্ন, ইত্যাদি একের পর এক অবৈধ নৈপুণ্য এবং কসরত করে যাচ্ছি। আল্লাহ আল্লাহ করছি কোনো মতে মহাসড়কে উঠবার জন্য। প্রায় ২০ মিনিটের ট্রেইল এর পর মহাসড়কে উঠতে পারা অনেকটা কেনিয়ার সাফারি পার্কে ২০ বছর অরক্ষিত অবস্থায় গোরাফেরা করার সমতুল্য।

গত ২০ মিনিট মন্ট্রিয়েল শহরে যেভাবে ফিল্মি স্টাইলে গাড়ি চালাচ্ছিলাম নেহায়েতই ভাগ্যের জোরে কাকতালীয়ভাবে মন্ট্রিয়েল এর কোনো পুলিশের সামনে পড়ি নাই। ঠিক এই জাতীয় ভুল সেন্ট্রাল লন্ডন এর কোথাও করলে হয়তো ১০ মিনিটের মাথায় লন্ডন পুলিশ আমার জন্য বিশেষ কনভোকেশন এর ব্যবস্থা করে বিনা কনভোকেশন এ আমার বহু কষ্টার্জিত ড্রাইভিং লাইসেন্সটি বাতিল করতঃ কিছু নির্দেশনামূলক দাওয়াই দিয়ে দিতো।

যাইহোক অবশেষে বহু কাঙ্খিত মহাসড়ক, তবে যত সহজ মনে করেছিলাম মোটেও তা না।এ যেন এক ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচা থেকে ততোধিক ক্ষুধার্ত এক সিংহের খাঁচায় পড়লাম। এখন আবার মনে হচ্ছে শহরেই ভালো ছিলাম। ঘন্টার পর ঘন্টা, শত শত মাইল গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। এ যেন অনন্তের উদ্দেশে যাত্রা। মহাসড়কের দুপাশ অতটা মনোরঞ্জন কিছু না। তবে মাঝে মাঝে কিছু দৃশ্য এতটাই মনোহরি যে কেবল নিঃস্পলক দৃষ্টিতে তাকায়ে থাকতে হয়। গ্রীষ্মকালে নাকি এই পথগুলো আরো চমৎকার দেখায়।

গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা ছিল দারুন মোহনীয় আবার ভীতিকর ও। যেদিকে গাড়ি চলছিলো সূর্যটাও সেদিকেই ডুবছিলো। রাস্তাতে কোনোরকম আঁকবাঁক নেই বললেই চলে। শতাদিক মাইলের পর মাইল একই রকম সোজা, কখনোবা একটু উঁচুনীচু। এটা একটা চমৎকার অনুভূতি যখন আপনি ধীরে ধীরে রাস্তার উপরের দিকে উঠছেন আর ঠিক ওদিকেই সূর্যটা ও ডুবছে, সূর্য ডুবার পূর্ব মুহূর্তের হলুদাভ রক্তিম আভা আপনার মুখে পড়ছে।

Image may contain: sky, outdoor and nature

আর আপনি গাড়ি চালিয়ে যখন নিচ থেকে উপরে উঠছেন তখন মনে হবে যেন অনেকগুলো লাল জোনাকি সারি বেঁধে আপনার সামনে দিয়ে উপরে উঠছে,আর আপনার বা দিক দিয়ে অনেকগুলো সাদা জোনাকি যেন সারি বেঁধে নিচে নেমে আসছে।আবার গাড়ির ইনসাইড মিরর এ পেছনের দৃশ্যটা দেখা যাবে ঠিক উল্টোটা, যেন সাদা জোনাকি গুলো সারি বেঁধে উপরে উঠছে এবং লাল গুলো সারি বেঁধে নিচে নামছে।

 

Image may contain: sky, cloud, twilight, outdoor and nature

এ এক বিবরণ অযোগ্য উপলব্দি, তা কেবল হৃদয়াঙ্গমই করতে হয়, অনুভূতি দিয়েই অনুভব করতে হয়। মন থেকে আপনা আপনিই যেন চলে আসছে – দিগন্ত পেরিয়ে দুহাত ওই বাড়িয়ে টেনেনিতে চায়, কে যেন আমায় টেনে নিতে চায়….

আশেপাশের শীতকালীন পত্রবিহীন (গ্রীষ্মকালে নাকি এগুলো আরো সুন্দর দেখায়) দন্ডায়মান বৃক্ষরাজি দেখে মনে হবে যেন রাস্তার দুপাশে অনেক বড়ো একেকটা অংকিত ক্যানভাস আপনার দেখার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

গাড়ি চালাতে চালাতে এবার কিন্তু কিছুটা সন্দিহান হয়েগেলাম। ছয় ঘন্টার উপরে কেবল গাড়িই চালালাম। এর মাঝে কয়েকবার পেট্রল নিতে হলো আর সেই সুবাদে কিছুক্ষন খাওয়াদাওয়া বাবদ রেস্ট ও নিলাম। কিন্তু গন্তব্যের কোনো হদিছ পাচ্ছিনা। ন্যাভিগেশন এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলো। ঠিক এই সময়েই পেট্রল নেওয়ার জন্য আবার একটি পেট্রল স্টেশন এর নির্দিষ্ট একটা পাম্পের সামনে গাড়ি রাখলাম। বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, ঠিক তখনি একজন মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলো সে কি গাড়িতে পেট্রল ভরতে সহযোগিতা করবে কিনা? আমাকে জানানো হলো আমি যে পাম্পের এখানে পার্ক করেছি এখানে থাকলে নিয়মানুযায়ী তাদের কেউ একজন গাড়িতে পেট্রল ভরে দিবে। যেটা তাঁদের ভাষায় ”ফুল সার্ভিস”

আমি তো থ, বলে কি? কি মজা!
কিন্তু পরক্ষনেই জানিয়ে দিলো ৪ পেনি অতিরিক্ত দিতে হবে। এখন এইরকম সুন্দর করে সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যদি ৪ পেনি অতিরিক্তর বিনিমিয়ে সার্ভিস দিতে চায়, তাহলে কি কোনোভাবে এড়ানো সম্ভব? এক্ষেত্রেও তা হলো না, কিন্তু এই অধমের বুজতে একটু সময় লাগলো যে আসলে এটা ছিল প্রতি লিটার এ অতিরিক্ত ৪ পেনি।

সে যাইহোক, চার পেনির যথার্থতা বুজানোর জন্য ভদ্র মহিলা বেশ আলাপ জুড়ে দিলো। গত কয়েকঘন্টা বিরামহীন গাড়ি চালিয়ে আলাপে অংশ নেওয়াটা এক বিরাট বিনোদন মনে হলো। আলাপের শুরুটা ঠিক এইরকম,
আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো।
আমি একটু হেসে বললাম ও আচ্ছা, তো এখন তাপমাত্রা কত?
বেশ আনন্দের সাথে জানলো যে -৫
হু, এতো চমৎকার আবহাওয়া নিয়ে কথা বলা আর বিনোদনের পর্যায়ে থাকলোনা, আমি চুপ।
এবার আমি বললাম যে নায়াগ্রা আর কতদূর, আমি নায়াগ্রা যাচ্ছি। এরপর যা শুনলাম তাতে তো তাপমাত্রা -৫০ হয়ে গেলো।

সে খুব সুন্দর করে বুজিয়ে দিলো যে আমি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে যা কিনা ”উইন্ডজর” এর দিকে যাচ্ছে (উইন্ডজর হলো কানাডা এবং আমেরিকার এর বর্ডার সিটি, অপর পারে আমেরিকার ডেট্রয়েট)। কেমন লাগে বলুন, এখন এই ন্যাভিগেশন এর জন্য প্রতিদিনের ৮.৩৬ ডলার চার্জ এর নিকুতি করতে ইচ্ছে হচ্ছে না?

তবে প্রতি লিটারের অতিরিক্ত ৪ পেনি যে চরম স্বার্থক হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নায়াগ্রার প্রকৃত দূরত্ব এখন ৬৫২ কি.মি. থেকে প্রায় ৯০০ তে গিয়ে ঠেকছে। ন্যাভিগেশন এ নতুন করে ঠিকানা সেট করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। রাত তখন ৯টার ও কিছু বেশি হবে। চারিদিকে গুটগুটে অন্ধকার। মহাসড়কে কোনো লাইট নাই। কেবল দু দিকের গাড়ির আলোই রাস্তার সহায়।

এই মুহূর্তে নতুন করে যাত্রা শুরু করাটা আমার কাছে গহিঁন জঙ্গলে সোনামুখী সুঁই খোঁজার মতো অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। চলতে চলতে হটাৎ করে কেউ আমাকে লাইট ফ্ল্যাশ করলো, খুবই বিরক্ত লাগলো। ঘন্টা খানেক আগেও এরকমটা হয়েছিলো। আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম এহেন কর্মকান্ডে।

হটাৎ করে গাড়ির ইনসাইড মিরর এ আমার পিছনে একটা পুলিশের গাড়ি দেখতে পেলাম। আমি কিছুটা ভয় পেলাম কিন্তু গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে পুলিশের গাড়ি বেশ কাছে চলে এসেছে। কিন্তু কোনোরকম হর্ন দিচ্ছিলোনা। আমি লেইন পরিবর্তন করে পাশের লেইন এ চলে আসলাম। পুলিশের গাড়িও একই লেইনে চলে আসলো। এবার আমার আর বুজতে কোনো অসুবিধা হলোনা যে নিশ্চয়ই আমার জন্য কোনো দাওয়াত পত্র অপেক্ষা করছে। কোনোরকম আর দেরি না করে সর্ব ডানের লেইন (হার্ড শোল্ডার) এ গাড়ি থামালাম। পুলিশ ও থামলো। আমি উইন্ডো খোলা মাত্র একজন পুলিশ অফিসার আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসলেন। প্রথমেই অত্যন্ত ভদ্রভাবে বললো আমি যেন ভিতরেই বসে থাকি, তারপর জিজ্ঞেস করলো আমি কেমন আছি, সব কিছু ঠিকঠাক তো? স্বাভাবিক ভাবে ই উত্তর দিলাম আর মনে মনে বললাম ভাই এতক্ষন তো ভালোই ছিলাম, আপনার সাথে কথা বলার পর থেকে তো আর কিছু ভালো ঠেকছে না।

আর বেশি দেরি না করে সরাসরি কাজের কথায় চলে আসলো। সরাসরি প্রশ্ন, আমি স্পিড লিমিট ক্রস করছি কেনো? কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম কই নাতো! সে আরো বললো যে রাস্তায় তোমাকে তিন বার ফ্ল্যাশ করা সত্ত্বেও তুমি স্পিড লিমিট ক্রস করেই যাচ্ছো। এই বার আমি ফ্ল্যাশ এর মাহাত্ম বুজতে পারলাম। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করি যে আমি স্পিড লিমিট ক্রস করি নাই। অফিসার জানালো যে আমি ১৪০ এর উপরে ড্রাইভ করছি,
আমি নির্বাক,
তাঁকে জানালাম যে আমি রাস্তার সাইন অনুযায়ী ঘন্টায় ৭০-১০০ মাইল গতিতেই গাড়ি চালাচ্ছি এবং সাথে সাথে এটাও স্বীকার করলাম যে মাঝে মাঝে আমি ১১০- ১২০ মাইল পর্যন্ত চালাইছি। আমার কথা শুনে পুলিশ অফিসার শুধু এইটুকুই বললো যে, স্যার, এটা মাইল এর পথ নয় এটা কিলোমিটারের পথ।

এই কথা শুনার পর কি আর বলবো ঠিক বুজে উঠতে পারছিনা। তার মানে আমি প্রায় গত ৮ ঘন্টা যাবত ই নির্ধারিত স্পিড এর উপরে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। পুলিশ অফিসার আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গেলো। কিছুক্ষন পর আবার ফিরে এলো। আমি তাকে বোজাতে চেষ্টা করলাম যে আমি এখানে নতুন এবং আমি আমার ন্যাভিগেশন ফলো করছি। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পরে গেলাম, কি হয় কি হয় ভেবে। আল্লাহর অশেষ রহমতে কিছু হলোনা (এখন ও পর্যন্ত তাই বিশ্বাস করছি)। সে আমার লাইসেন্স ফেরত দিলো এবং নিজের হাতে আমার ন্যাভিগেশন এর মাইল এর অপসন পরিবর্তন করে কিলোমিটার করে দিলো এবং সেইফ ড্রাইভ উইশ করে চলে গেলো। ভয় এবং কৃতজ্ঞতায় মনটা বেশ আনচান করছিলো। ঠিক বুজে উঠতে পারছিনা কি দিয়ে কি হয়ে গেলো।

একটা বিষয় ভীষণভাবে উপলব্দি করলাম যে, কোনো সৌন্ধর্য্যের উপভোগই সহজলভ কিছু না, হউক সে প্রাকৃতিক কিংবা মানবিক।

অবশেষে রাত ১২টার ও পরে নায়াগ্রার কাছাকাছি আগে থেকে বুকিং করা B&B এর কাছাকাছি পৌঁছলাম।

সেও এক আজব ব্যাপার। বাড়ির মালিক ই মেইল এর মাধ্যমে জানিয়ে দিলো যে বাড়ির বাইরে লেটার বক্স এ চাবি থাকবে, সেখান থেকে চাবি নিয়ে যেন বাড়িতে ঢুকি। মনে মনে ভাবছি বাদশাহ হারুনের সিলসিলা চলছে নাকি এখানে! লেটার বক্স এ চাবি রাখা, শুনতে ই যেন কেমন লাগছে। রাতের পরিবেশ, কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই, যেন জন মানবহীন এক জনপদ, কোন লেটার বক্স এ হাত ঢুকাবো ঠিক বুজতেছিনা। যাই হউক শেষমেশ পাওয়া গেলো।

Image may contain: house, tree, plant, sky, outdoor and nature

একটা সুন্দর কাঠের দোতলা বাড়ি, যার এক অংশে বাড়ির মালিক (সম্ভবত) নিজেই থাকেন আর অপর অংশ টুরিস্টদের কাছে ভাড়া দেন। ভালো ব্যবসা ,নায়াগ্রার কল্যাণে এই এলাকার মানুষ বেশ ভালো ব্যবসাই করছে। যথারীতি লেটার বক্স থেকে চাবি নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলাম।

ও মা এতো দেখি আরেক আশ্চর্য্য!

(চলবে, সামনে আসছে নায়াগ্রা টু শিকাগো)

লেখকঃ মোহাম্মদ শিবলী সাদিক
email: shibli.sadeque@outlook.com