সন্তানদের খাবার কিনতে চুল বিক্রি করলেন মা

225

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সাত বছর বয়সী ছেলে কালিয়াপ্পান স্কুল থেকে ফিরে খাবার চায়। তারপর সে ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করে। তখন কি করবেন ভেবে পান না ৩১ বছর বয়সী প্রেমা সেলভাম। করণ তার কাছে এমন কিছু দ্রব্য ছিল না যা বিক্রি করে তিনি বাচ্চাদের জন্য খাবার কিনতে পারেন। তখন তিনি নিজের মাথার সব চুল বিক্রি করে দেন। এই নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে মোদির দেশ ভারতে।

তামিলনাড়ুর বাসিন্দা সালেম জেলার বাসিন্দা প্রেমা সেলভাম। তার অভাবের সংসারে চাল আনতে নুন ফুরায় অবস্থা। কিন্তু গত ৩ জানুয়ারি ঘরে কিছুই ছিল না। তাই চুলায় হাড়ি চড়েনি সেদিন। কিন্তু অবুঝ শিশুরা তো এত কিছু বোঝে না। স্কুল থেকে এসে মায়ের কাছে খাবার চায় সাত বছরের কালিয়াপ্পান।

তখন দুঃখে কলিজা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা প্রেমা। তার ঘরে এমন কিছু ছিল না যা বিক্রি করে দু মুঠো খাবার জোগাড় করতে পারে। সেদিনে কথা বলতে গিয়ে কান্নজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তাদের মুখে তুলে দেয়ার মতো আমার কাছে কিছুই ছিল না। এটা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। এটা আমার হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যদি আমার বাচ্চাদের খাবার দিতে না পারি তাহলে বেঁচে থেকে কী হবে?’

‘আমার কাছে ১০ রূপির একটা নোটও ছিল না। আমার কাছে শুধু প্লাস্টিকের কয়েকটি বালতি ছিল।’ বলছিলেন প্রেমা।

এরপরই তার মনে পড়ে, তার কাছে আর একটি মুল্যবান জিনিস আছে, যা হলো তার মাথার চুল। এরপরই চুল বিক্রি করার জন্য দোকানে ছুটে যান প্রেমা।

‘একটা দোকানের কথা আমার মনে ছিল যেটি চুল কিনতো। আমি সেখানে গিয়ে আমার পুরো মাথার চুল ১৫০ রুপিতে বিক্রি করে দেই।’

দেড়শ টাকা হয়তো সামান্যই অর্থ। আমাদের দেশে অনেকে হয়তো এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে একটা বার্গার কিনে খান। কিন্তু প্রেমার জন্য এটা ছিলো অনেক টাকা। এ দিয়ে তিন সন্তানের জন্য ২০ রুপি করে তিন প্যাকেট ভাত কিনে আনেন। ভাত পেয়ে সন্তানদের সে কী আনন্দ! সন্তানদের সাথে ভাগাভাগি করে সেই খাবার খেয়েছিলো প্রেমাও। কিন্তু এটা ছিল ক্ষণিকের আনন্দ মাত্র।

প্রেমা জানতো যে সে তার শেষ উপায় ব্যবহার করে ফেলেছে এবং পরের বেলা সে কিভাবে তার পরিবারকে খেতে দেবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

বছরের পর বছর ধরে স্বামীর সাথে একটি ইটের ভাঁটায় কাজ করতেন প্রেমা। মোটামুটি ভালোই চলছিল সংসার। হঠাৎ করেই তার স্বামী নিজেই ইটের ভাটার মালিক হওয়ার পরিকল্পনা করেন। এজন্য মোটা টাকা ঋণ নেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি ঋণ শোধ করতে না পেরে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে সাত মাস আগে আত্মহত্যা করেন।

উপায় না পেয়ে স্বামীর পথ অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন প্রেমাও। তিনি দোকানে কীটনাশক কিনতে যান। কিন্তু টের পেয়ে দোকানদার তাকে তাড়িয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে এসে আত্মহত্যার অন্য উপায়ে খুঁজতে থাকেন। করবী গাছের বীজ তুলে সেগুলো পিষে মিশ্রণ তৈরি করতে শুরু করেন। ভাগ্যক্রমে, তার বোন দেখে ফেলে এবং তাকে সেই বিষাক্ত মিশ্রণ খেতে বাঁধা দেয়। ফলে আত্মহত্যা করা হয় না প্রেমার। কিন্তু স্বামীর নেয়া এত অর্থ কীভাবে শোধ করবেন তিনি। দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম কেটেছে কত যে রাত!

কিন্তু হঠাৎ করেই দয়ালু ব্যক্তি বালা মুরুগানের সঙ্গে দেখা হয় প্রেমার। তার সংস্পর্শে এসে পাল্টে যায় তার জীবন। এখন আর আত্মহত্যা করার কথা ভাবেন না প্রেমা।

বালা প্রেমাকে তার নিজের জীবনের ঘটনা বলে এবং তাকে আশান্বিত হওয়ার কথা বলে। বন্ধু প্রভুর সাথে মিলেবালা তাকে খাবার কেনার জন্য কিছু অর্থ দেয়। এরপর পুরো ঘটনাটি বালা ফেসবুকে লেখেন। আর এ থেকে একদিনের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার রুপি জোড়ার হয়। পরে প্রেমার অনুরোধে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করেন বালা।

এখন নতুন করে পরিশ্রম শুরু করেছেন প্রেমা। প্রতিমাসে তিনি বিভিন্ন ঋণদাতাকে ৭০০ রুপি করে দেন। জেলা কর্তৃপক্ষও তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। ফলে প্রেমার দুঃখের দিন অনেকটাই কেটে গেছে। তার মাথায়ও চুল গজাতে শুরু করেছে।

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, প্রেমার গল্পটিই একমাত্র ঘটনা নয়। ভারতে যতই প্রবৃদ্ধির কথা বলা হউক না কেন, দেশটিতে প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করতেই হিমশিম খায় লাখ লাখ মানুষ।

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, নাইজেরিয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চরম দারিদ্র্য আক্রান্ত মানুষদের (যাদের দৈনিক আয় ১.৯০ ডলারে কম) বাস ভারতে।

প্রেমাকে চারজনের খাবার যোগাড় করতে হয়। যেদিন তিনি আয় করেন সেদিনও তার পারিশ্রমিক জনপ্রতি ৭২ সেন্টেরও কম হয়। ফলে প্রেমা দরিদ্রদের মধ্যেও দরিদ্র।

বালা মুরুগান প্রেমাকে তার সাহায্য দেয়া অব্যাহত রেখেছে। আর নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন তামিলনাড়ুর ওই মা-ও। প্রেমা বলেন,‘এখন আমি বুঝি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি বাকি ঋণ শোধ দেয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।’

সূত্র: বিবিসি